র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন' (এসআরবি) নামের নতুন বাহিনী গঠনের উদ্যোগকে একটি পুরোনো বাহিনীকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, প্রস্তাবিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এর দুর্বল জবাবদিহি ব্যবস্থা, অস্পষ্ট ও ব্যাপক ক্ষমতা এবং বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগের কারণে র‍্যাবের বিতর্কিত সংস্কৃতি নতুন বাহিনীতেও বজায় থাকতে পারে।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, র‍্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। তবে কেবল একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করলেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত হয় না। র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ ও প্রমাণ রয়েছে। এসব অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে নতুন বাহিনীর জনবল, ক্ষমতা, কাঠামো, বলপ্রয়োগের নিয়ম এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। তা না হলে এসআরবি মূলত একই ক্ষমতার আরেকটি বাহিনীতে পরিণত হবে।

প্রস্তাবিত বিলে এসআরবিকে সাধারণ তদন্ত, অভিযান, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারির মতো ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলে টিআইবি উল্লেখ করেছে। একই সাথে বিলে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা’ ও ‘সরকার কর্তৃক নির্দেশিত অন্যান্য দায়িত্ব’—এমন কিছু অস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমন এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর ফলে অতীতের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে আইনি বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়। তা ছাড়া, শুধু সন্দেহের বশে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তার এবং বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান নিয়েও টিআইবি গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই বিধানগুলো বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সাথে সাংঘর্ষিক।

নতুন বাহিনীতে র‍্যাবের বর্তমান জনবলকে সরাসরি স্থানান্তরের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে টিআইবি। সংস্থাটি মনে করে, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া র‍্যাব সদস্যদের ঢালাওভাবে এসআরবিতে যুক্ত করা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও নতুন বাহিনীতে স্থান পেয়ে যাবে। এই ঝুঁকি এড়াতে জাতিসংঘের সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম (এসএসআর) এবং ডিডিআর মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘ভেটিং’ বা যাচাই প্রক্রিয়া চালুর দাবি জানিয়েছে টিআইবি, যাতে গুম, নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত কেউ নতুন বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে।

প্রস্তাবিত এসআরবি বিলের ২২ ধারায় উল্লিখিত অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিলে বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তাদেরই সহকর্মীদের দিয়ে তদন্ত করালে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হবে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যাহত হবে। এর পরিবর্তে পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত, মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। একই সাথে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং আইনি সুরক্ষার বিধান রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

টিআইবি মনে করে, র‍্যাব বিলুপ্তির পর নতুন বাহিনী গঠনের এই প্রক্রিয়াটি সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ, স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাই এবং কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান জোর দিয়ে বলেন, র‍্যাব বিলুপ্তির উদ্যোগটি কেবল খোলস পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। এর মাধ্যমে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে একটি জবাবদিহিমূলক নতুন আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি。

উল্লেখ্য, ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এর বিভিন্ন ধারার বিশ্লেষণ ও নির্দিষ্ট সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত পলিসি ব্রিফ ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে এই সুপারিশগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।