সংবাদপত্র শিল্পের সংকট ও উত্তরণের পথনকশা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির ইতিহাসে সংবাদপত্র কেবল একটি শিল্প নয়; এটি জাতির বিবেক, রাষ্ট্রের আয়না এবং জনগণের কণ্ঠস্বর। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে যেমন সংবাদপত্র সত্যকে ধারণ করেছে, তেমনি স্বাধীনতার পর দুর্নীতি, বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও জনদুর্ভোগের বিষয়গুলোও জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রের বহু ইতিবাচক অর্জন যেমন সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পেয়েছে, তেমনি অসংখ্য ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে সাংবাদিকতার মাধ্যমে।

আজ বিশ্বব্যাপী সংবাদপত্র শিল্প এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, পাঠকের অভ্যাসের পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং বিজ্ঞাপন বাজারের পুনর্বিন্যাস সংবাদপত্রের প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে সংবাদপত্র শিল্পের সংকটকে কেবল একটি ব্যবসায়িক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি তথ্যের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় প্রশ্ন। বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান বলেছিলেন, “There can be no higher law in journalism than to tell the truth.” সত্য বলার এই দায়িত্ব পালনের জন্য সংবাদপত্রকে টিকে থাকতেই হবে।

বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক। নিউজপ্রিন্ট, কালি, প্লেট, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং মুদ্রণ ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সময়ে বিজ্ঞাপন আয় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না; বরং একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে। ইউনেস্কোর এক গবেষণা বলছে, বর্তমানে Google ও Meta বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বিজ্ঞাপন আয়ের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। গত এক দশকে বিশ্বে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন আয় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। অর্থাৎ সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার ব্যয় বহন করছে সংবাদপত্র; কিন্তু বিজ্ঞাপনের বড় অংশ চলে যাচ্ছে অন্য প্ল্যাটফর্মে। এটি কেবল অর্থনৈতিক অসমতা নয়; এটি তথ্য অর্থনীতির এক নতুন বাস্তবতা।

বর্তমান যুগকে অনেক গবেষক “Attention Economy” বা মনোযোগের অর্থনীতি বলে আখ্যায়িত করছেন। মানুষের হাতে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের আধিক্য রয়েছে। সংকট হলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী সংবাদে আস্থার হার নেমে এসেছে ৩৭ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে সংবাদ এড়িয়ে চলার প্রবণতাও বাড়ছে। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ সংবাদপত্র বা সংবাদ ওয়েবসাইটের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে সংবাদ গ্রহণ করছে। এ পরিস্থিতি সংবাদপত্র শিল্পের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও। কারণ ভুয়া তথ্যের বিস্তার যত বাড়ছে, নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার প্রয়োজন ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাংবাদিকের কলম স্বাধীন রাখতে হলে জীবিকাও নিরাপদ হতে হবে। সংবাদপত্র শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো মানবসম্পদ সংকট। কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা অনেক দক্ষ সাংবাদিককে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য করছে। অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্য বিশ্লেষণ, ডেটা জার্নালিজম কিংবা আন্তর্জাতিক মানের রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল। যে সাংবাদিক প্রতিনিয়ত নিজের চাকরি নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তাঁর কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানী কাজ প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।