ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার (৫ আগস্ট) ভারতের নয়াদিল্লি থেকে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টার সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছর ধরে তিনি বিভিন্ন অডিও বার্তা ও ই-মেইল সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখলেও, নয়াদিল্লির কোনো আয়োজনে সরাসরি এভাবে যুক্ত হওয়া এবারই প্রথম।
শেখ হাসিনার এই দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী মত রয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, নিজের রাজনৈতিক গুরুত্ব বজায় রাখা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টায় তিনি এই ঘোষণা দিয়ে থাকতে পারেন। তবে কুগেলম্যানের মতে, এটি কেবল রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে দেশে ফিরে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটানোর একটি ইচ্ছা হতে পারে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করেন, এটি দলের নেতা-কর্মীদের আনুগত্যের প্রতিদান দেওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে মাহমুদুর রহমান মান্না এই ঘোষণাকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদারের মতে, বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও তিনি এটি ব্যবহার করতে পারেন।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেপ্তারের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তার এই প্রত্যাবর্তন সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষকে সক্রিয় করে তুলতে পারে, যা দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করবে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে এবং বিচারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
শেখ হাসিনার এই সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের কাছে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারীকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি একে চরম অবমাননা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ৩ আগস্ট পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে সতর্ক করেছিলেন যে, শেখ হাসিনার এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে এই ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভারত সরকার অবশ্য দাবি করেছে, এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে জোর করে পাঠানো ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে তার স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন সম্পর্কের উত্তেজনা কমাতে পারে। বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের যে চেষ্টা চলছে, তাতে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং ৩০ বছর মেয়াদি ওই চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।

