চট্টগ্রামে পিংক বাস সার্ভিস: এক মাসেই হোঁচট, উঠছে নানা অভিযোগ

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ৫০

চট্টগ্রামে কর্মজীবী নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু হওয়া বিআরটিসির বিশেষ ‘পিংক বাস’ সার্ভিসটি উদ্বোধনের এক মাস না পেরোতেই নানা সংকটে পড়েছে। নারী চালকের পরিবর্তে পুরুষ চালক দিয়ে বাস চালানো, রুট পরিবর্তন ও যাত্রী ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার কারণে শুরুতেই হোঁচট খাচ্ছে এই সেবা।

গত ১৮ আগস্ট নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সামনে থেকে এই বিশেষ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। এই বহরে রয়েছে দুটি বাস। এর মধ্যে ৭৫ আসনের একটি দোতলা বাস কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার রুটে এবং ৪৫ আসনের একটি একতলা বাস বালুছড়ার নতুনপাড়া থেকে পতেঙ্গা রুটে চলাচলের কথা রয়েছে। দূরত্ব অনুযায়ী এই বাসগুলোর ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ৬৮ টাকা।

তবে চালুর পরই দেখা গেছে নানা বিপত্তি। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই বাসগুলো ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানা অধ্যুষিত সিইপিজেড এলাকাটি নির্ধারিত রুটের অংশ হলেও সেখানে বাস দুটিকে যাতায়াত করতে দেখা যায়নি। এছাড়া, কালুরঘাটের প্রায় দুই কিলোমিটার আগে একটি মাদরাসার সামনে থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থী তুলতে দেখা যায় ৭৫ আসনের দোতলা বাসটিকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দুটি বাসের কোনোটিই তাদের রুট পুরোপুরি মানছে না। চালকের আসনে নারী থাকার কথা থাকলেও সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন পুরুষ চালক, আর নারী চালকদের পেছনের আসনে বসে থাকতে দেখা গেছে। এমনকি বাসে পুরুষ যাত্রীও উঠছেন এবং নারী যাত্রীদের চেয়ে শিক্ষার্থী পরিবহনেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ আসন পুরুষ ও শিক্ষার্থীদের দখলে থাকায় কর্মজীবী নারীরা আগের মতোই সাধারণ গণপরিবহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই বিষয়ে দোতলা বাসের নারী চালক সুস্মিতা রানী জানান, যানজট ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের মুখে তারা বাস চালাতে পারেন না বলে সহযোগিতার জন্য একজন পুরুষ চালক রাখা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ সময় পুরুষ চালক বাস চালায়—এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেন, তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং রাতে বাস চলে না। বাসের সুপারভাইজার শীলা আক্তার দাবি করেন, শহরে নারী যাত্রীর সংকট থাকায় প্রতিদিন মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তোলা হয় এবং তাদের সঙ্গে মায়েরা থাকেন। তবে এর কিছুক্ষণ পরই নগরের ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে বাসে পুরুষ যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

বাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিআরটিসির পুরুষ চালক রাজু শেখ বলেন, নারী চালকরা এখনো পুরোপুরি দক্ষ না হওয়ায় বিআরটিসি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী মাঝে মাঝে বাস চালান। এদিকে বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, দোতলা বাসটিতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। জ্বালানি, চারজন কর্মীর খাবার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে বর্তমানে বাস দুটি লোকসানে চলছে। অন্য চালকদের মতে, কর্মজীবী নারীদের বসবাস রয়েছে এমন এলাকায় বাসগুলো নিয়মিত না যাওয়ার কারণেই নারী যাত্রীর সংকট তৈরি হচ্ছে।

এদিকে নারী চালকদের ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণে নারী চালকরা ভারী লাইসেন্স পেয়ে গেলেও অনেক পুরুষ চালক দীর্ঘ বছর ধরে আবেদন করেও তা পাচ্ছেন না। বাসচালক শহীদুল ইসলাম জানান, ২০১৭ সালে হালকা লাইসেন্স পেয়েও ১০ বছরে তিনি ভারী লাইসেন্স পাননি, অথচ নারীরা সহজেই তা পেয়ে গেছেন। কালুরঘাট সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল আবছার অভিযোগ করেন, অদক্ষ চালকদের কারণে সড়কে ঝুঁকি বাড়ছে এবং গত এক সপ্তাহে পিংক বাস পাঁচটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসন শুধু উদ্বোধনের দায়িত্বে ছিল, বাসটি পরিচালনা করছে বিআরটিসি। তাই এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবে। অন্যদিকে বিআরটিসির চট্টগ্রাম বাস ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার কামরুজ্জামান বলেন, নারী চালকদের বাড়ি চট্টগ্রামে না হওয়ায় তারা রাস্তাঘাট ভালোভাবে চেনেন না, তাই সহায়তার জন্য পুরুষ চালক রাখা হয়েছে। তারা দক্ষ হলে পুরুষ চালক সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি পুরুষ যাত্রী তোলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছাত্রীরা এই বাসে উঠতে পারবেন। লোকসানের বিষয়টি তার জানা নেই তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাস দুটি চলবে।