চট্টগ্রামের পাহাড়ে গড়ে উঠছে আরেকটি জঙ্গল সলিমপুর

চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকায় পাহাড়ের গা বেয়ে গড়ে উঠেছে সারি সারি টিন, বাঁশ ও বেড়ার ছোট ছোট ঘর। পাহাড়ের ঢাল কেটে সমান করা জমিতে এসব বসতি তৈরি করা হয়েছে। কোথাও নতুন ঘরের কাঠামো উঠছে, কোথাও কাটা মাটি পড়ে আছে। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা এই বসতিগুলো বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরের শুরুর দিকের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০ নম্বর বিএস দাগের মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি ভূমি। সরেজমিনে দেখা যায়, এসব এলাকার বড় অংশ জুড়ে পাহাড় রয়েছে এবং সেখানে কয়েক শ পরিবার বসবাস করছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায় দখল হওয়া জমির সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন, তবে স্যাটেলাইট ছবিতে পুরো এলাকায় বসতির বিস্তৃতি স্পষ্ট।

এই এলাকায় বসতির ইতিহাস প্রায় চার দশক পুরনো। ১৯৮৬ সালের দিকে মোহাম্মদ মানিক নামের এক ব্যক্তি ৩ নম্বর বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর সন্দ্বীপ ও হাতিয়াসহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে এখানে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষরা ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়ে জায়গা কিনেছেন বলে দাবি করেন। তবে কোনো বৈধ মালিকানার দলিল দেখাতে পারেননি তারা। পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা সাত লাখ টাকায় হাতবদলের লিখিত কাগজও পাওয়া গেছে, যেখানে জমির শ্রেণি 'টিলা' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থান পরিদর্শন করে ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট বা প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলামসহ ১৪ জনের সম্পৃক্ততার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় পাহাড় কাটা ও ঘর নির্মাণ চলত। হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সাথে মো. হোসাইনের নাম এলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। এছাড়া মো. রুবেলের বিরুদ্ধেও পাহাড় কাটা ও জায়গা হাতবদলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেন। তবে তার বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেছেন, 'আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।' পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা জানান, সরকারি খাসজমি কীভাবে কেনাবেচা হচ্ছে, তা তদন্ত করতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে চিঠি দেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের মতে, অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি এবং পরে সেই বসতির আড়ালে পাহাড় কেটে সমতল করা একটি পরিচিত প্রবণতা। জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে পাহাড় কাটা ও দখল বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।