দেশের কর্মক্ষম মানুষের কষ্টার্জিত টাকায় কেনা খাবারই এখন তাদের অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বাজারে এমন কোনো খাদ্যপণ্য নেই যেখানে বিষের অস্তিত্ব নেই। শাকসবজিতে ক্যাডমিয়াম ও ভারী ধাতুর পাশাপাশি পানিতে মলের জীবাণু, শিশুখাদ্যে অতিরিক্ত সিসা, ভোজ্যতেলে ট্রান্সফ্যাট এবং গুড় ও মুড়িতে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
বিএফএসএ কর্তৃক ১৯ জেলা থেকে সংগৃহীত নমুনার পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব বিষ মানবদেহে প্রবেশ করছে। ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা জানান, বর্তমানে দুধ, মাছ, মাংস ও ফলমূলসহ প্রায় সব খাদ্যেই ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, যা ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগসহ হৃদরোগ ও শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সবজির নমুনা সংগ্রহ করে ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসার অস্তিত্ব মিলেছে। পরীক্ষার ফলাফলে দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ, খাগড়াছড়িতে ৬০ সিএফইউ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম বা মলের জীবাণু পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, নিরাপদ পানিতে ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতি শূন্য থাকার কথা, অন্যথায় এটি আমাশয়, ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের কারণ হয়।
শাকসবজির পরীক্ষায় ১.১৬ থেকে ২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসা এবং ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়াম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া কিছু নমুনায় ই-কোলাই ও সালমোনেলা জীবাণুও পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসা ও ক্যাডমিয়াম স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির স্থায়ী ক্ষতি করে। এদিকে গুড়ে নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং মুড়িতে ইউরিয়ার উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছে। লবণে আয়োডিনের অসামঞ্জস্যতা এবং হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায় নিম্নমানের উপাদান পাওয়া গেছে।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড এবং সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ও অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট ধরা পড়েছে। একইভাবে মধু, ঘি, মিল্ক পাউডার এবং বিভিন্ন ফলের পানীয়তে ভেজাল উপাদান, অতিরিক্ত সুক্রোজ ও ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভের প্রমাণ মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ একে নীরব ঘাতক হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করতে এবং সমস্যা চিহ্নিত করে এক মাসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।

