বারবার ছাড় পেয়েও ব্যাংকে ফিরছে না খেলাপি ঋণ

দেশে খেলাপি ঋণ ও পুনঃ তফসিল করা ঋণ—দুটোই বেড়েছে। অথচ ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়ার সময় বরাবরই বলা হয়েছে, এতে ব্যাংকের আটকে থাকা টাকা ফেরত আসবে, সমস্যায় পড়া ব্যবসা সচল হবে এবং খেলাপি ঋণ কমবে। বাস্তবে ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কমলেও সেই হারে আদায় বাড়েনি; বরং পুনঃ তফসিল করা ঋণের বড় অংশ আবার খেলাপি হয়েছে। তাই পুরোনো প্রশ্নটিই আবার সামনে এসেছে—ঢালাওভাবে ঋণখেলাপিদের ছাড় দিয়ে কি সমস্যার সমাধান করা যায়, নাকি এতে কিছু ঋণগ্রহীতা শুধু বাড়তি সময় পান আর সমস্যাটি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৩১ আগস্ট খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা আরও বাড়িয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠীর ঋণস্থিতি এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি হলে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১৫ বছরে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। আগে এ সময় ছিল ১০ বছর। এ সুবিধার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। প্রয়োজনীয় কিস্তি বা ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ব্যাংকগুলোকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। ২০২৫ সালের নীতিসহায়তা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাছাই কমিটির মাধ্যমে যারা আগে সুবিধা পেয়েছে, তারাও আবার আবেদন করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানিসংকট, বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ব্যবসার গতি কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৮ মাসের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন করে বিশেষ নীতিসহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তখন ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে, দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর ২৪ নভেম্বর সুবিধার আওতা বাড়ানো হয়। ওই বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত খেলাপি হওয়া ঋণও এই সুবিধার যোগ্য হয়। অশ্রেণিকৃত ও আগে পুনঃ তফসিল করা মেয়াদি ঋণ পরিশোধে অতিরিক্ত দুই বছর এবং এক্সিট সুবিধায় আরও এক বছর সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এর তিন মাস পর, ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার নিয়ম আরও সহজ করা হয়। আবেদনের সময় নির্ধারিত ডাউন পেমেন্টের অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক পরবর্তী ছয় মাসে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। এর তিন মাসের মধ্যে, ৭ মে আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ জুন করা হয়। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট তা আবার বাড়িয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে কখনো সুবিধার আওতা, কখনো ডাউন পেমেন্ট, কখনো আবেদনের সময়, আবার কখনো ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমান নীতিতে বড় ঋণ গ্রাহকেরাই বেশি সুযোগ পাবেন। শুধু ঋণের অঙ্ক বড় বলেই বেশি সুবিধা দেওয়া হলে এ নিয়ে ন্যায্যতার প্রশ্নও ওঠে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সামান্য ঋণ খেলাপি হলেই ব্যাংকের স্বাভাবিক সুবিধা হারান। অথচ বড় ঋণগ্রহীতারা আরও বেশি সময় পাচ্ছেন। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের চেয়ে বড় খেলাপি হওয়াই বেশি লাভজনক মনে হতে পারে। ব্যাংকের বিতরণ করা প্রায় প্রতি তিন টাকার এক টাকা খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গত দুই বছরে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ার একটি কারণ হলো পুরোনো ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাওয়া। রাজনৈতিক প্রভাব, আদালতের স্থগিতাদেশ, পুনঃ তফসিল, বিশেষ ছাড় ও ভুল শ্রেণীকরণের কারণে দীর্ঘদিন অনেক মন্দ ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর ঋণ পর্যালোচনা ও নিরীক্ষায় এসব ঋণের একটি অংশ সামনে চলে এসেছে।

পুনঃ তফসিল করলেও যে ফল পাওয়া যায় না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকই বলছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃ তফসিল করা ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা বা ৩৮ দশমিক ৪২ শতাংশ আবার খেলাপি হয়ে গেছে। ২০২০ সালে পুনঃ তফসিল করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হওয়ার হার ছিল ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চার বছরের মধ্যে তা ৩৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়েও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। সাম্প্রতিক হিসাবেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পরের তিন মাসে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনের পর ডিসেম্বর শেষে তা ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নামে; কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে আবার তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিল করা নতুন ঘটনা নয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সুদ মওকুফ ও সহজ কিস্তিতে খেলাপিদের ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নিয়ম শিথিল করার অধ্যায় নতুন করে শুরু হয়। ২০১২ সালে সর্বোচ্চ তিনবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ রাখা হয়। ২০১৫ সালে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ পুনর্গঠন কর্মসূচি চালু করা হয়। এরপর বড় পরিবর্তন আসে ২০১৯ সালে। মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। করোনার সময় নিয়ম আরও শিথিল করা হয়। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ চারবার ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। আর বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা মিলিয়ে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২৯ বছর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সুবিধাও দেওয়া হয়। প্রতিবারই বলা হয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও টেকসই ব্যবসা রক্ষায় এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করার কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে সাময়িক সহায়তা ধীরে ধীরে নিয়মিত ছাড়ে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের নীতির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কিছু মিল ও অমিল রয়েছে। নেপালে ছয় মাস নিয়মিত কিস্তি দিলেই খেলাপি ঋণ সরাসরি নিয়মিত হয় না। দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা মূলত সংকটে পড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সুবিধা দিয়েছে। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে ব্যাংক যাচাই করে দেখে, সংকটটি সাময়িক কি না, ব্যবসা টিকবে কি না এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত কি না। দেশটির ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৮ শতাংশ। পাকিস্তানে পুনঃ তফসিল করলেই ঋণ নিয়মিত হয়ে যায় না। দেশটির খেলাপি ঋণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে কঠোর আইনি কাঠামো ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অতীতের মতো যেন দেওয়া সুবিধার অপব্যবহার যেন না হয়, তা দেখতে হবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি দরকার। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারও থাকতে হবে। দেশে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। বড় ঋণখেলাপিদের বারবার সুবিধা দেওয়াকে অনেকে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু ঋণ পুনঃ তফসিলের সুযোগ দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন ব্যবসার প্রকৃত পুনর্গঠন। কারণ, শুধু সময় বাড়িয়ে কিংবা কাগজে ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সুবিধা পাওয়ার পর ব্যবসা ঠিকভাবে চলছে এবং নিয়মিত কিস্তি দিচ্ছে কি না, তারও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা কঠোর অবস্থান নেয়।

১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কোরিয়া অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন বা কেএএমসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নেয়।