ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল সব তথ্য। একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডের পূর্বপরিকল্পনা, হাদিকে অনুসরণ, হামলার পর খুনিদের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালানোর কৌশল এবং তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই স্পর্শকাতর মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা হলে তা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে পারে এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টন থানার বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র হামলায় গুলিবিদ্ধ হন শরীফ ওসমান হাদি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ই ডিসেম্বর রাত ১০টায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাদি। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তার এই হত্যাকাণ্ড তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পী। বাপ্পী ঘটনার আগেই ২০২৫ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতের কলকাতায় চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানে নিজের পরিচয় গোপন করে মো. মহিদউদ্দিন চৌধুরী নামে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আধারকার্ড ও প্যানকার্ড তৈরি করে কলকাতার খিদিরপুরে অবস্থান করছেন। বাপ্পীর নির্দেশনাতেই ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদকে প্রধান শুটার এবং আদাবরের স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেল চালক হিসেবে এই মিশনে নিয়োগ করা হয়।
হামলার অন্তত চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির দৈনন্দিন গতিবিধি ও নিরাপত্তাবলয় পর্যবেক্ষণ করছিল। এমনকি ৯ই ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির একটি বৈঠকেও ভোটার বা কর্মীর ছদ্মবেশে ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন। হামলার আগের দিন ১১ই ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরের বাসায় গিয়ে পরিবারের সাথে শেষ দেখা করেন। তদন্তে দেখা গেছে, হামলাকারীরা যোগাযোগের জন্য একাধিক বেনামী সিম ও মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করেছিল। ঘটনার আগের রাতে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় সন্দেহভাজনদের অবস্থান ও যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। হামলার দিন ভোরে সাভারের মধুমতি মডেল টাউনের একটি কটেজে ফয়সাল ও আলমগীর অবস্থান করেছিলেন বলে র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে কটেজের কর্মী স্বীকার করেছেন।
घटनाর দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি জুমার নামাজের জন্য মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই মোটরসাইকেল নিয়ে ফয়সাল ও আলমগীর মসজিদের পাশে খলিল হোটেলের গলিতে অবস্থান নেন। নামাজ শেষে দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে হাদি একটি অটোরিকশায় চড়ে রওনা দিলে খুনিরা তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে। অটোরিকশাটি শাপলা চত্বর হয়ে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে ৭.২ বোরের রিভলবার দিয়ে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এরপর তারা বিজয়নগর হয়ে পালিয়ে যান।
হত্যাকাণ্ডের পর দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান ফয়সাল ও আলমগীর। ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ স্থানীয় চোরাকারবারিরা তাদের সীমান্ত পারাপার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা ভারতের কারাগারে রয়েছেন। সেখানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও এনআইএ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা ও অর্থদাতাদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। বাংলাদেশে ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীনকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
হত্যাকাণ্ডের ২১ দিনের মধ্যে ডিবি পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিলেও হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ মূল পরিকল্পনাকারী ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়াল করার অভিযোগ এনে আদালতে নারাজি আবেদন করে। হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চের নারাজি আবেদন বিবেচনায় নিয়ে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। সিআইডি বর্তমানে হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, অর্থায়নের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, দেশীয় রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপারে সহায়তাকারী নেটওয়ার্ক এবং ভারতে আশ্রয় গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত করছে। সিআইডি তদন্তে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার পাশাপাশি ১২০(বি) ধারায় সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে উপস্থিত না থেকেও পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্ররোচনা, অস্ত্র সরবরাহ, আশ্রয়দান বা অপরাধীদের পালাতে সহায়তাকারীদের মূল অপরাধের সহযোগী হিসেবে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেতে বিলম্ব হওয়ায় সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও, আসামিদের বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা চলায় এবং বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় মানবাধিকার সংক্রান্ত জটিলতায় তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চ এই বিচার প্রক্রিয়াকে সাধারণ ফৌজদারি মামলার বাইরে রেখে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। সংগঠনটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের ফাঁসি ও মূল পরিকল্পনাকারীদের বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে তা জননিরাপত্তা ও সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো একে সরকারের সদিচ্ছার অভাব হিসেবে তুলে ধরে বড় ধরনের আন্দোলনের ইস্যু বানাতে পারে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

