গফরগাঁওয়ে পরচুলা তৈরি করে ভাগ্য বদলাচ্ছেন হাজারো গ্রামীণ নারী

একসময় যা গৃহস্থালির আবর্জনা হিসেবে ড্রেনে কিংবা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হতো, সেই কাঁচা চুলকে ঘিরেই এখন তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের পরচুলা বা উইগ। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কারিগরি নিপুণতার ছোঁয়ায় এই ফেলে দেওয়া চুলই এখন আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার অজপাড়াগাঁ পোড়াবাড়ীয়াতে এই পরচুলা তৈরিকে কেন্দ্র করে সূচনা ঘটেছে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লবের, যা স্থানীয় হাজারো অসচ্ছল গ্রামীণ নারীর সামাজিক ও আর্থিক জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে। নিত্যদিনের সংসারের যাবতীয় ঝক্কি-ঝামেলা সামলে অথবা নিকটস্থ কুটির শিল্প কারখানায় শ্রম দিয়ে স্থানীয় নারীরা প্রতি মাসে এক সম্মানজনক ও সুনির্দিষ্ট অংকের অর্থ উপার্জন করছেন।

কারখানায় কর্মরত একেকজন নারী শ্রমিক তাদের উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে মাসে গড়ে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন। এই উপার্জিত অর্থ পাক্ষিক ও মাসিক ভিত্তিতে সরাসরি তাদের হাতে বা ব্যাংকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অভাব-অনটনে জর্জরিত পরিবারগুলোতে দীর্ঘদিনের দৈন্যদশার স্থায়ী অবসান ঘটে এসেছে নতুন আশার আলো। একসময় চরম অর্থনৈতিক অনটন, অভাব আর অনিশ্চয়তায় দিন পার করা সুবিধাবঞ্চিত গৃহিণী ও নারীরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। কারও সংসারে যেখানে দুবেলা অন্ন সংস্থান কঠিন ছিল, কিংবা কেউবা ঋণ আর দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিলেন, তারা এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছেন।

পোড়াবাড়ীয়ার গৃহিণী হোসনা আক্তার তার করুণ অতীত স্মরণ করে আবেগপ্লুত হয়ে জানান, পূর্বে স্বামীর একার উপার্জনে সংসারে চরম অভাব-অনটন লেগে থাকত। সন্তানদের সুশিক্ষা ও মৌলিক চাহিদা মেটানোও ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে পরচুলা তৈরির সূক্ষ্ম কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিত অর্থ উপার্জন করছেন। বর্তমানে নিজস্ব উপার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ভার বহনের পাশাপাশি সংসারের নানাবিধ প্রয়োজনে ভূমিকা রাখছেন তিনি। শুধু হোসনা আক্তারই নন, তার পরিবারের প্রায় ৭ জন সদস্য এই খাতে কাজ করে মাসে ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

অনাহারে-অর্ধাহারে কাটানো দিনগুলো এখন অতীত বলে জানান অপর নারী শ্রমিক তামান্না আক্তার। পরচুলার সুতা বেঁধে অর্জিত আয়ে তিনি পূর্বের ঋণ পরিশোধ করেছেন, দুটি গরু কিনেছেন এবং সংসারের শক্ত হাল ধরে দুই রুমের পাকা বিল্ডিং তৈরি করেছেন। একইভাবে দুঃখ-কষ্ট কাটিয়ে তিল তিল করে ৩টি গরু কিনেছেন ও বাড়িতে পানির মোটর বসিয়েছেন নারী শ্রমিক লাইলী আক্তার। অন্যদিকে, আবুল হোসেনের চার মেয়ে কারখানায় কাজ করে মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা উপার্জন করছেন এবং পরিবারের প্রধান অর্থ জোগানদারে পরিণত হয়েছেন। গ্রামের অপর সুবিধাভোগী ছালমা আক্তার জানান, অতীতে গ্রামীণ নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত থাকলেও নিজ গৃহের নিকটে এমন নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি হওয়ায় তাদের সামাজিক মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তা জহিরুল ইসলাম জানান, পোড়াবাড়ীয়া এখন এই অঞ্চলের প্রধান উইগ হাব হলেও কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন সংকট এই শিল্পের বড় বাধা। ব্যাংক ঋণের জটিলতা নিরসন করে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ ও রপ্তানি সুবিধা দিলে এটি জেলা অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। প্রবীণ শিক্ষাবিদ হাবিবুর রহমানের মতে, গ্রামে এমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় শহরমুখী অভিবাসন কমেছে এবং নারীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে তরল অর্থের প্রবাহ আশাতীতভাবে বেড়েছে।

পিবাড়ীয়া গ্রুপের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ২০০ অসচ্ছল নারী সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করেন। কর্মরত নারীদের চলাচলের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন সুবিধা থাকলেও যাতায়াতের সুবিধার্থে এলাকার ১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। গফরগাঁও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে জানান, পিছিয়ে পড়া নারীদের মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার এই মডেলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি অব্যাহত রয়েছে।

এই উদ্যোগের নেপথ্য গল্প তুলে ধরে পিবাড়ীয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান রানা বলেন, আমরা মূলত একটি আন্তর্জাতিক কোরিয়ান কোম্পানির আধুনিক পরচুলা তৈরির কৌশল ও বৈশ্বিক চাহিদা দেখে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সেই প্রেরণা থেকেই নিজ জন্মভূমিতে অবহেলিত ও অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে এই শিল্পের গোড়াপত্তন করি। আজ ময়মনসিংহ, গফরগাঁও, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলাসহ দেশের নানা প্রান্তে আমাদের প্রায় ১৮টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কৃত্রিমভাবে প্রক্রিয়াজাত কাঁচা চুল থেকে নিখুঁত কারুকাজে তৈরি উইগ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের প্রায় ২২টি দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের অধীনে প্রায় ২ হাজার নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক ও নীতিগত সরকারি সহযোগিতা পেলে আগামীতে এই খাতে আরও ১০ হাজার বেকার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।