খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াছুর পাহাড়ি সড়ক। দুপাশে সবুজের সমারোহ, পাহাড়ের ঢালে গাছপালা আর বাঁশঝাড়ের মাঝে মাঝে উঁকি দেয় পাহাড়ি বাড়িঘর। এই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই এখন এক অন্যরকম রক্তিম সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে বুনো ফুল ‘লালভান্ডি’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘প্যাগোডা ফুল’ নামেই বেশি পরিচিত। সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া উজ্জ্বল লাল রঙের এই ফুলগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কেউ সবুজ ক্যানভাসে আগুনরাঙা রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে।
বৈজ্ঞানিকভাবে ‘Clerodendrum paniculatum’ নামে পরিচিত এই ফুলটি Clerodendrum গণের একটি আকর্ষণীয় শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ। ইংরেজিতে একে ‘Pagoda Flower’ বলা হয়। ফুলগুলো একটির ওপর আরেকটি স্তরে স্তরে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে, যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা বৌদ্ধ প্যাগোডার মতো আকৃতি তৈরি করে। অসংখ্য ছোট ছোট লাল বা কমলা-লাল ফুল একসঙ্গে ফুটে এই বড় ও দৃষ্টিনন্দন পুষ্পমঞ্জরি গঠন করে। এর লম্বা ও সরু পুংকেশর ফুলটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। উজ্জ্বল রঙের কারণে এই ফুল খুব সহজেই প্রজাপতিসহ বিভিন্ন পরাগায়নকারী পতঙ্গকে আকর্ষণ করে। সাধারণত জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি এবং আংশিক আলো-ছায়াযুক্ত স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এই গাছটি বেশ ভালো বেড়ে ওঠে।
মাটিরাঙ্গার ওয়াছু এলাকার পাহাড়ি পথে হাঁটলে স্থানীয়দের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার ছবি চোখে পড়ে। সড়কের পাশের ছোট টং দোকানে চলে চায়ের আড্ডা, কোথাও চলে ছক্কা-গুটির খেলা, আবার খোলা জায়গায় কিশোর-তরুণরা মেতে ওঠে ফুটবল খেলায়। ব্যস্ত জীবন থেকে দূরে শান্ত এই পরিবেশের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে লালভান্ডি বা প্যাগোডা ফুল। ওয়াছুর বাসিন্দা তাহের মিয়ার বাড়ির সামনে দেখা মিলেছে এমন একটি ফুলের গাছের। তিনি জানান, বনে কাজ করতে গিয়ে এই ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একটি গাছ এনে বাড়ির সামনে লাগিয়েছিলেন। এখন তাতে ফুল ফুটে পুরো চারপাশ সুন্দর করে তুলেছে। পথচারীরা যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়িয়ে ফুলটির সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং অনেকে ছবি তুলে নিয়ে যান।
একইভাবে নিজের বাড়ির আঙিনায় এই গাছ লাগিয়েছেন ওয়াছুর আরেক বাসিন্দা রাম্রাচাই। তিনি বলেন, এক আত্মীয়ের বাড়িতে এই ফুল দেখে ভালো লেগেছিল, তাই একটি গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। পাহাড়ে অনেক ধরনের ফুল ফুটলেও এর গুচ্ছাকার গঠন ও উজ্জ্বল লাল রঙের সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা। এ এলাকার আরও বেশ কিছু বাড়ির আঙিনায় এই দৃষ্টিনন্দন ফুল ফুটতে দেখা গেছে।
পথচারী আবদুর রহমান তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সবুজের মাঝে হঠাৎ লাল ফুলগুলো চোখে পড়ে। প্রথমে এটিকে কোনো বিশেষ জাতের ফুল মনে হয়েছিল। কাছে গিয়ে দেখেন অসংখ্য ছোট ফুল একসঙ্গে ফুটে আছে, যা সত্যি দেখার মতো।
প্রকৃতিপ্রেমী জাফর মিয়া মনে করেন, পাহাড়ের আসল সৌন্দর্য শুধু বড় পাহাড় বা ঝরনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই ধরনের ছোট বুনো ফুলও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। তাই এসব প্রাকৃতিক উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম এ বিষয়ে জানান, লালভান্ডি বা প্যাগোডা ফুল একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে এ ধরনের দেশীয় উদ্ভিদের উপস্থিতি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে তোলে। অপ্রয়োজনে এই গাছগুলো কেটে ফেলা বা নষ্ট না করে এগুলোকে সংরক্ষণ করা উচিত বলে তিনি পরামর্শ দেন।
সবুজ পাহাড়ের মাঝে ফুটে থাকা এই রক্তিম প্যাগোডা ফুল যেন মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পগুলো সবসময় বড় আয়োজনে নয়, বরং কখনো কখনো পথের ধারে কিংবা বাড়ির আঙিনায় অত্যন্ত নীরবেই ডালপালা মেলে ধরে।

