পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হলেন সাচিং প্রু জেরী

বান্দরবানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ সাচিং প্রু জেরী এবার জাতীয় রাজনীতিতে পেলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে বান্দরবান-৩০০ আসনের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। বান্দরবান থেকে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া স্থানীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তার নতুন দায়িত্ব ঘিরে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায়ও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা।

সাচিং প্রু জেরী বোমাং সার্কেলের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি অং শৈ প্রু চৌধুরীর ছেলে এবং বোমাং রাজপরিবারের রাজপুত্র হিসেবে পরিচিত। রাজপরিবারের ঐতিহ্য তার সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি স্থানীয় সরকার, দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮৬ সালে বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৯ সালে স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার ও দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বান্দরবান আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত পুনর্নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উশৈসিং জয়ী হলে তার প্রথম সংসদীয় অধ্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপর দীর্ঘ সময় জাতীয় সংসদের বাইরে থাকলেও বান্দরবানের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। সাচিং প্রু জেরী বান্দরবান সদর উপজেলা এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন এবং পাহাড়ি এলাকার উন্নয়ন বাস্তবতার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি বান্দরবান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও বান্দরবান-৩০০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাচিং প্রু জেরী। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পর জাতীয় সংসদে তার প্রত্যাবর্তন ঘটে। নির্বাচনী প্রচারণায় বান্দরবানের পানি সংকট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় সাচিং প্রু জেরীর সামনে এখন তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির উন্নয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশার তালিকায় রয়েছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ, সড়ক যোগাযোগ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, পর্যটনের বিকাশ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতেও তার কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন অনেকে। ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন যেমন বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র, তেমনি রয়েছে দীর্ঘদিনের নানা জটিলতা ও সমস্যা। নতুন দায়িত্বে সাচিং প্রু জেরীর সামনে তাই শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়; পাহাড়ের মানুষের আস্থা অর্জন, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়, দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বোমাং রাজপরিবারের সন্তান হিসেবে সামাজিক পরিচিতি, স্থানীয় সরকারে নেতৃত্ব, দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি এবং সংসদ সদস্য হিসেবে অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে সাচিং প্রু জেরীর রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ১৯৮০-এর দশকে স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে প্রবেশ, দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ২০২৬ সালে সংসদে প্রত্যাবর্তন এবং এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া—তার রাজনৈতিক জীবনে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নতুন দায়িত্বে সাচিং প্রু জেরী পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন, এখন সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে বান্দরবানসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম।