শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ভারতের নিজস্ব বিষয়: চিফ প্রসিকিউটর

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের আদালতের অনুমোদন নেওয়া হবে নাকি দেশটির সরকার নিজস্ব সিদ্ধান্তে পাঠাবে, তা সম্পূর্ণ ভারতের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। ছাত্র-জনতার তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এর আগে ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালের পর ২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করা শেখ হাসিনা ছাত্রজীবন থেকেই সব ধরনের গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন। এ crusade কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্য ও রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এর আগে ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডে অবস্থানকালেই তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। দেশে ফিরে ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী শেখ হাসিনা ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পঞ্চম জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন। সে সময় রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগঠিত করেছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা বহুবার কারাবরণ ও গৃহবন্দী হয়েছেন। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সামরিক সরকার তাঁকে আটক করে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বর মাসে দুবার এবং ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ আটক করে প্রায় তিন মাস তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়। এ ছাড়া ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে ১৫ দিন, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর থেকে এক মাস এবং ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁকে গৃহবন্দী বা অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৬ জুলাই তিনি কারাবন্দী হন এবং ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্তি পান। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাঁর দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে।

চিফ প্রসিকিউটর (chief prosecutor) এর ছবি (রেফারেন্স: svwg13u3, 15072026)।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে এক জনসভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাঁকে লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়। এই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন, যার মধ্যে আইভি রহমানও ছিলেন। এ ছাড়া পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হন এবং শেখ হাসিনা নিজেও কানে আঘাত পান।

শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদানের জন্য শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার ও ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ২৫ বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের জন্য ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো তাঁকে ‘হুপে-বোয়ানি’ শান্তি পুরস্কার দেয়। ২০০৯ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল ট্রাস্ট তাঁকে ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কারে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি ব্রিটেনের গ্লোবাল ডাইভার্সিটি পুরস্কার, দুবার সাউথ সাউথ পুরস্কার, ২০১৪ সালে ইউনেস্কোর ‘শান্তির বৃক্ষ’, ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরামের রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কার লাভ করেন। কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদনে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মাননা সনদ দেয়। একই বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি তাঁকে সর্বোচ্চ পরিবেশ পুরস্কার ‘চ্যাম্পীবন অব দ্য আর্থ’ এবং আইটিইউ ‘আইসিটিজ ইন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।

শেখ হাসিনা বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন, যার মধ্যে ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘ওরা টোকাই কেন?’, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, ‘দারিদ্ব্য বিমোচন, কিছু ভাবনা’, ‘আমার স্বপ্ন, আমার সংগ্রাম’, ‘আমরা জনগণের কথা বলতে এসেছি’, ‘সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র’, ‘সাদা কালো, সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ এবং ‘Miles to Go, The Quest for Vision-2021’ অন্যতম। প্রযুক্তি, রান্না, গান এবং বই পড়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তাঁর স্বামী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে ইন্তেকাল করেন। তাঁদের এক ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁদের মেয়ে সায়মা হোসেন ওয়াজেদ একজন মনোবিজ্ঞানী, যিনি অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণে কাজ করছেন। শেখ হাসিনার নাতি-নাতনির সংখ্যা সাতজন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, International Crimes Tribunal News

prothomalo-bangla/2026-08-16/h7814bur/foreign-ministry.jpeg