দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানকার জনগোষ্ঠী মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেক স্থানেই নেই সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা অবকাঠামো। এই বাস্তবতায় পাহাড়ের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে সরকার ই-লার্নিং বা ইলেকট্রনিক লার্নিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে অনলাইনে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক কঠিন বিষয়গুলো শেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ই-লার্নিংয়ের প্রসার ঘটলেও করোনা মহামারির সময় বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এখন পার্বত্য অঞ্চলেও ডিজিটাল শিক্ষার পরিধি বিস্তৃত করা হচ্ছে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মতো দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগও তৈরি হচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ১২টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শিক্ষাক্রমের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তিন পার্বত্য জেলার মোট ১৪৯টি বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির ৫৫০টি বিদ্যালয়ে টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া সংযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, দুর্গম এলাকায় ভালো ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা যেতে আগ্রহী হন না, কারণ সেখানে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে শিক্ষকরা অনলাইনে পাঠদান করতে পারছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে। এছাড়া যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, সেখানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিখোর সহপ্রতিষ্ঠাতা জিশান জাকারিয়া জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে অভিভাবকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে তারা নিয়মিত সেমিনার আয়োজন করে থাকেন। ই-ক্যাবের অ্যাড-টেক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মনির হোসেনের মতে, ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে অভিভাবকরা সহজেই সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি ও ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, যা এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, শিক্ষার পাশাপাশি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো জরুরি। তাদের মতে, জুম চাষের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং কফি, কাজুবাদাম ও ড্রাগন ফলের মতো উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিলে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। যথাযথ ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ই-লার্নিং পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের জন্য বৈষম্যহীন ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

