এসএসসিতে অকৃতকার্য ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কী?

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন শিক্ষার্থী। ফল শোনার পরই অন্তত চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বভাবতই বিরাজ করছে হতাশা ও অবসাদ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী যারা পাস করেননি, তাদের শিক্ষাজীবন অধিকাংশেরই এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রামের উলিপুরের মার্জিয়া খাতুন গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় গণিতে ফেল করেছিলেন। মা মারা যাওয়ার পর বাবার দায়িত্ব ও পরিবারের চাপে তিনি আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা যখন দেন তখন তার বিয়ে নিয়ে কথা চলছিল। মার্জিয়া জানান, তার ভাইয়েরা কেউই এইচএইচসি’র পর লেখাপড়া করেনি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে পড়াশোনা করাটা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তিনি গণিতে ফেল করার পর আর পরীক্ষা দেননি, কেউ চাপও দেয়নি, তার নিজেরও ইচ্ছা ছিল না। একইভাবে গাইবান্ধার মো. মিলন ২০২৫ সালে দুই বিষয়ে ফেল করেছিলেন। তিনি ২০২৬ সালে আর পরীক্ষা দেননি। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া ও আয়ের সন্ধানে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে গাইবান্ধায় ফ্রিজ, টিভি ও ওভেন মেরামতের কাজে সহযোগিতা করছেন।

উত্তরাঞ্চলের তিন জেলা রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থা ‘রং পেন্সিল’ ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শিক্ষার অবস্থা নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার ৬২ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর মধ্যে পরবর্তী বছর পরীক্ষা দেয় মাত্র ১৮ জন। এই ১৮ জনের মধ্যে ৪ জন পুনরায় ফেল করে। আর ৬২ জনের মধ্যে ৫৫ জনই বিয়ে বা নিয়মিত-অনিয়মিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই ৬২ জনের মধ্যে ২৯ জন ছিল ছাত্রী।

বাংলাদেশে শিক্ষায় ঝরে পড়া নতুন কিছু নয়। ব্যানবেইস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২.৮৫ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৫.৯৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের হারটি ছেলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩০.৬৩ শতাংশ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৩৪.৮৭ শতাংশ। বিবিএস-২০২৩ এর তথ্যানুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ বিয়ের কারণে পড়াশোনা ছেড়েছে, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১ শতাংশ। অন্যান্য কারণের মধ্যে কাজ, আর্থিক অসচ্ছলতা, পড়াশোনায় অনীহা এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে না আসা রয়েছে।

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শিক্ষক ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীরা এক ধরণের মানসিক ট্যাবুর মধ্যে পড়ে যায়। অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী ক্লাসে পাস করে গেলেও বোর্ড পরীক্ষায় আর পারে না। অনেক মেয়ে নবম-দশম শ্রেণিতে উঠলেই বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করে। তিনি একটি মেয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বিয়ে আটকানো গেলেও পরে সে মোবাইলে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। কুড়িগ্রামের চরের শিক্ষক সাদেকুল ইসলাম জানান, এসব এলাকায় এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়েই না। মেয়েদের জন্য এসএসসি পাস করে আরও লেখাপড়া করা কষ্টসাধ্য। তিনি বলেন, এসএসসি ফেল করা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী আর লেখাপড়ায় ফিরবে না। অধিকাংশের ফেরার ইচ্ছাও নেই। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবে আর ছেলেরা আনস্কিলড কাজে যুক্ত হবে। তাই তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহমিদা আক্তার বলেন, ফেল করা শিক্ষার্থীরা আর লেখাপড়া করুক আর না করুক, তাদের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখা জরুরি। সামাজিকভাবে তাদের হেয় করা যাবে না। শিক্ষা গবেষক রেজওয়ানুল ইসলাম মনে করেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সবাইকে প্রচলিত ধারায় না ফিরিয়ে তাদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা জরুরি। ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল, কম্পিউটার, কৃষি ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে তারা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রফেসর ড. এসএম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থী কেন ফেল করল তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। তিনি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরামর্শ দেন। গতকাল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি ফেসবুক বার্তায় বলেন, ফলাফল আশানুরূপ না হওয়া বেদনার, তবে অকৃতকার্য হওয়া মানেই জীবনের গল্প শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আজকের এই ফল কারও মূল পরিচয় হতে পারে না।