মাতারবাড়ী কি ভারতের অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

একটি দেশের মানচিত্রের ভেতরে যখন এমন এক টুকরো ভূমি তৈরি করা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের নিজস্ব চড়া শুল্ক, ট্যাক্স আর আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আইন করে অচল করে দেওয়া হয়, অর্থনীতিতে তাকেই বলা হয় ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ বা মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল। আপাতদৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের ভেতরে অন্য রাষ্ট্র মনে হলেও, এর মূল লক্ষ্য থাকে কর মওকুফ ও শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং লজিস্টিকস হাব হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মহাসড়কে যুক্ত হওয়া। তবে এই ধারণার গভীরে লুকানো থাকে মারপ্যাঁচে ভরা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। যখন কোনো জোন গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা কেবল স্থানীয় উৎপাদন কেন্দ্র থাকে না, বরং পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও ট্রানজিট বাণিজ্যের টানাপোড়েনের নোঙরে পরিণত হয়।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী দ্বীপে বাংলাদেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন ও গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উচ্ছ্বাসের ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সেই অমোঘ সত্যটি এখানে প্রাসঙ্গিক—‘পুঁজিবাদের দ্বারা শোষিত হওয়ার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, শোষিত হওয়ার সুযোগটুকুও না পাওয়া।’ বাংলাদেশ কি প্রথম ট্র্যাজেডি থেকে বাঁচতে গিয়ে দ্বিতীয়টির দিকে হাঁটছে, সেই প্রশ্ন এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

মাতারবাড়ী জোনে ভারত যে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে, তা মানচিত্র ও ভারতের পরিবহন ব্যয়ের খতিয়ান দেখলেই স্পষ্ট হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর অর্থনীতি এতদিন শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর জিম্মি ছিল। মাতারবাড়ী ফ্রি ট্রেড জোন চালু হলে কলকাতা থেকে আগরতলায় পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। এছাড়া সস্তায় কাঁচামাল এনে এখানকার শ্রম ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করে ভারত সহজেই তা আসিয়ান বাজারে রপ্তানি করতে পারবে। ফলে মাতারবাড়ী কার্যত বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনীতির এক অবিশ্বাস্য করিডোর বা লাইফলাইনে পরিণত হতে যাচ্ছে।

মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের মডেল ব্যবহার করে দেশগুলো ভাগ্য বদলালেও সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকিও থাকে। পানামার কোলন ফ্রি ট্রেড জোন আমেরিকার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মূল অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অর্থ পাচার ও কাস্টমস ফাঁকির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। মেক্সিকোর ম্যাকিলাডোরা জোনগুলোতেও মার্কিন কোম্পানিগুলো সস্তা শ্রম ব্যবহার করে বিলিয়ন ডলার আয় করলেও মেক্সিকোর নিজস্ব শিল্প-সক্ষমতা তৈরি হয়নি, বরং তারা পেয়েছে পরিবেশ দূষণ। মাতারবাড়ী কি দুবাই বা শেনজেনের মতো হবে, নাকি কোলন বা ম্যাকিলাডোরার মতো অন্যের সস্তা আড়তদার হবে—তা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

মাতারবাড়ীর এই প্রকল্প রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। ২০১৪ সালে জাইকার অর্থায়নে আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও, হাসিনা সরকার সাগরের ১৮ দশমিক ৫ মিটার গভীরতাকে কাজে লাগিয়ে একে পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরের মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ’ (MIDA)-এর আওতায় ৩৭টি মেগা প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল, যেখানে অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার চেয়ে রাজনৈতিক চটক ও ভূরাজনৈতিক কার্ড খেলাই ছিল মুখ্য। এই প্রকল্পকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন ভারত ও জাপানকে বঙ্গোপসাগরের এই স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে জায়গা দিয়ে পশ্চিমাদের খুশি রাখা যায়, অথচ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি আড়ালে পড়ে গেছে।

বঙ্গোপসাগরের এই দাবার চালে শুরুতে চীন আগ্রহী থাকলেও ভারতের আপত্তির মুখে এবং চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশল রুখতে হাসিনা সরকার জাপানকে বেছে নেয়। জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ীকে সাজানো হয়। যদিও চীন সরাসরি নেই, তবে তারা এর ওপর কড়া নজর রাখছে। মাতারবাড়ী পুরোপুরি ভারত-জাপান অক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতায় থাকা পায়রা বা মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ এখন এক ভূরাজনৈতিক স্যান্ডউইচে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় আছে, যেখানে এক ইঞ্চি ভুল চালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে।