সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে জনজীবন ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। গত ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর মধ্যেই ১০ থেকে ১৫ আগস্টের জন্য এলএনজিবাহী কার্গো সরবরাহে কোনো কোম্পানি রাজি না হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও ১০ থেকে ১৫ আগস্টের দুটি কার্গোর জন্য কোনো কোম্পানি সাড়া দেয়নি। যদিও ১৫-১৬ আগস্টের জন্য একটি কার্গো সরবরাহে ভিটল এশিয়া লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। প্রতি ইউনিট এলএনজি তারা ২২ দশমিক ৩৫ ডলারে সরবরাহ করবে এবং এই দরে এক কার্গো এলএনজির দাম পড়বে ৯৪৯ কোটি ৪৩ লাখ ১২ হাজার ১৮৪ টাকা।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি সচল না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহকারীরা এলএনজি পাঠাতে অনাগ্রহী। বর্তমানে সামিটের টার্মিনাল দিয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৫০ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সামিটের টার্মিনালের জন্য আনা একটি কার্গো মঙ্গলবার পর্যন্ত চলবে এবং ৫ আগস্ট আরেকটি কার্গো পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এক্সিলারেট, কাতার এনার্জি, আরামকো ও ওমান গ্যাসের মতো কোম্পানিগুলো সরবরাহ স্থগিত রাখায় সংকট আরও জটিল হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে টোটাল কোম্পানির একটি এলএনজিবাহী জাহাজ টার্মিনাল সচলের অপেক্ষায় ছয় দিন ধরে নোঙর করে আছে। এছাড়া গানবোর এশিয়ার একটি কার্গো ৯ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে আসার কথা থাকলেও টার্মিনাল চালুর নিশ্চয়তা না থাকায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন তলানিতে নেমেছে এবং লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকাল ৩টায় ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট এবং বিকাল ৫টায় ২ হাজার ৬৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে।
রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে ওপরের নির্দেশে কিছু বাড়তি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। তিতাস গ্যাস সিস্টেম কোম্পানির জন্য রোববার রাত ১২টার পর থেকে দৈনিক ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বাখরাবাদ, কর্ণফুলী ও জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকরা তুলনামূলক কম গ্যাস পাচ্ছেন। রোববার সারা দেশে মোট ২১৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস পেয়েছে ১২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলী ২১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদ ২১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদ ২৯ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চল ৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন বিতরণ কোম্পানি ৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে।
সারা দেশে গ্যাসের সংকটে দিশেহারা মানুষ। ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এতে শিল্পে উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকা ছাড়াও সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিংসহ অর্থনীতিতে নানামুখী বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কবে টার্মিনালটি সচল হবে, তা নিয়ে যখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, তখনই গ্যাস সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, ১০-১৫ আগস্ট দুটি এলএনজিবাহী কার্গো সরবরাহে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি রাজি না হওয়ায় এ সংকট সামনে এসেছে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে টেন্ডারও আহ্বান করা হয়েছিল। টেন্ডারে কোনো কোম্পানি এলএনজিবাহী কার্গো সরবরাহে রাজি হয়নি। ফলে গ্যাস নিয়ে চলমান সংকট আরও তীব্র হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি আংশিক চালু করা সম্ভব হলেও এলএনজিবাহী কার্গোর অভাবে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে মারাত্মকভাবে। সূত্র বলছে, টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার পর এলএনজি আমদানি সূচিতে বিপর্যয় ঘটে। যার কারণে বন্ধ টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত কোনো সরবরাহকারী এলএনজি দিতে চাচ্ছে না।
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও এক্সিলারেট, কাতার এনার্জি, আরামকো, ওমান গ্যাসসহ কয়েকটি কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য-যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রসেসিং প্ল্যান্ট এবং ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই গ্যাস সরবরাহ তারা স্থগিত করেছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এখন এই কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের বিপদে ১০ থেকে ১৫ আগস্টের জন্য ২-৩টি কার্গো বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দিতে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ সাড়া দিয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে টোটাল কোম্পানির একটি এলএনজিবাহী জাহাজ প্রায় ৬ দিন অপেক্ষা করছে। এটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য আনা হয়েছিল। যে কোনো মুহূর্তে ওই টার্মিনাল চালু হলে ওই কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করা হবে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য গানবোর এশিয়ার একটি কার্গো রেডি রাখা হয়েছে। সেটি ৯ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে দেশে আসার কথা। কিন্তু টার্মিনালটি কবে চালু হবে এবং ওই এলএনজি কবে খালাস করা হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এক্সিলারেট এখনো সুনিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।

