রাজশাহীতে ২৫ কোটির পলিনেট হাউস প্রকল্প ব্যর্থ, সাফল্যের বানোয়াট গল্পের অভিযোগ

নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরব্যাপী উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের স্বপ্ন দেখিয়ে রাজশাহী বিভাগে শুরু হওয়া ‘পলিনেট হাউস’ প্রকল্প তিন বছরের মাথায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বেশিরভাগ হাউসেই এখন কোনো ফসল উৎপাদিত হচ্ছে না। উল্টো লোকসানের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা। এর মধ্যেও কৃষি বিভাগের আয়োজিত অনুষ্ঠানে কৃষকদের ডেকে নিয়ে জোর করে সাফল্যের বানোয়াট গল্প বলানোর অভিযোগ উঠেছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়। বিশেষ পলিথিন, নেট ও লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি এই ঘরগুলো নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা, যার প্রতিটি তৈরিতে গড়ে খরচ পড়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিকূল আবহাওয়া ও রোগবালাই থেকে ফসল ও চারা সুরক্ষিত রেখে তাপমাত্রা ও সেচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বছরজুড়ে চাষাবাদ করার কথা ছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, পলিনেট হাউস পাওয়া কৃষকদের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি করেছে কৃষি বিভাগ। চুক্তির শর্তে বলা হয়েছে, হাউসের কোনো পরিবর্তন বা ধ্বংস করা যাবে না, কোনো মৌসুমে এটি ফেলে রাখা যাবে না এবং কৃষককে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাউস ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক মাসের মধ্যে কৃষককেই তা মেরামত করতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে বা হাউস অব্যবহৃত রাখলে নির্মাণের পুরো টাকা সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক বিঘা জমির ২৫ শতাংশের ওপর এই নেট হাউস নির্মাণে চাষিদের কোনো টাকা দিতে হয়নি। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ওপরে পলিথিন ও নিচে নেট দিয়ে ৬০ শতাংশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মিক্সড ইরিগেশন বা মিস্ট পদ্ধতিতে কুয়াশার মতো পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে এতে। এই হাউসে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসাসহ বিভিন্ন সবজি ও ফুল চাষের কথা বলা হয়েছিল।

তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১০২টি পলিনেট হাউসের মধ্যে রাজশাহীতে ২২টি, নাটোরে ২৯টি, নওগাঁয় ৭টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি, পাবনায় ১৭টি, জয়পুরহাটে ৬টি, বগুড়ায় ১১টি ও সিরাজগঞ্জে ৪টি রয়েছে। এছাড়া হর্টিকালচার সেন্টারগুলোতে আরও ৯টি হাউস করার পরিকল্পনা আছে। সম্প্রতি পাবনা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৬ জন চাষির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে ১০ জনই এই হাউসে চাষ করে বড় ধরনের লোকসানের শিকার হয়েছেন। সরেজমিনে ঈশ্বরদী, বাঘা ও পবার সাতটি হাউস ঘুরে দেখা যায়, চারটির পলিথিন ছেঁড়া এবং একটির পলিথিন সম্পূর্ণ খুলে ফেলা হয়েছে।

পাবনার ঈশ্বরদীর বখতারপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম জানান, হাউসের ভেতরে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে কোনো শ্রমিক কাজ করতে চান না। কোনো ফসলই ঠিকমতো না হওয়ায় তিনি পলিথিন খুলে এখন শুধু লোহার কাঠামোর ভেতরে পটোল চাষ করছেন। অথচ জমিটি ইজারা দিলে তিনি বছরে এক লাখ টাকা পেতেন। মহাদেবপুর গ্রামের শাহিনুজ্জামান গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও করলা চাষে ব্যর্থ হয়ে এখন হাউসের এক পাশে আঙুর গাছ লাগিয়েছেন। জগন্নাথপুর গ্রামের বেলি বেগমের হাউসে পালংশাক ও টমেটোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। রাজশাহীর পবার মর্তুজা আহমেদ জানান, কোনো ফসল চাষ করে এক টাকাও লাভ করতে পারেননি, উল্টো তাঁর ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, পলিনেট হাউস পরিচালনায় তাঁদের কোনো বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। নওগাঁর রানীনগরের চাষি মাসুদ রানা জানান, এক বছর পর পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারে এক সভায় এক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে এক লাখ টাকার বিদেশি বীজ কিনে চাষ করতে গিয়ে তাঁর মোট ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কারিগরদের মতে ২০০ মাইক্রোন ঘনত্বের পলিথিন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ১০০ মাইক্রোনের কম ঘনত্বের পলিথিন দেওয়া হয়েছে। নওগাঁ সদরের আব্দুল লতিফ বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করায় সব ছিঁড়ে যাচ্ছে, এখন লোক দেখানোর জন্য শুধু আঙুর গাছ লাগিয়ে রাখা হয়েছে।

হাউসগুলোতে মিক্সড ইরিগেশন ও ড্রিপ সেচ পদ্ধতি থাকলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিতে অতিরিক্ত আয়রনের কারণে বেশিরভাগ মেশিন এক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকেরা জানান, মিস্ট পদ্ধতি সারাক্ষণ না চালালে ঘর ঠান্ডা হয় না, আর বেশি চালালে আর্দ্রতা বেড়ে ছত্রাক সংক্রমণ দেখা দেয়। প্রকল্প থেকে এগুলো মেরামত করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

তবে আগে থেকে যাঁরা পেশাদার নার্সারি মালিক বা ফুলচাষি ছিলেন, তাঁরা কিছুটা সুবিধা পাচ্ছেন। নাটোরের নলডাঙ্গার চারা উৎপাদনকারী ইলিয়াস শেখ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জারবেরা ফুলচাষি সাদিকুল ইসলাম, চারঘাটের মনোয়ার হোসেন এবং জয়পুরহাটের আমিনুল ইসলাম ক্যাকটাস ও চারা উৎপাদন করে লাভবান হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আমিনুল ইসলাম এই প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা নিতে নিজের খরচে ভারতেও গিয়েছিলেন।

এদিকে নওগাঁর এক চাষি জানান, প্রকল্পের এক বছর পর পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কড়া পাহারায় কৃষকদের জোর করে সাফল্যের বানোয়াট গল্প বলতে বাধ্য করা হয়। তবে এক চাষি মুখ ফসকে সত্য বলে দিলে সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। দুই বছর আগে নাটোরে প্রশিক্ষণ কর্মশালায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার চাষিরা লিখিত আবেদন দিয়ে হাউসগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী বলে জানান এবং উপযুক্ত বীজ সরবরাহের দাবি করেন। সেখানে বগুড়া সদরের এক চাষিকে সফল বলে প্রচার করা হলেও তিনি একে ‘লোকদেখানো প্রকল্প’ বলে অভিহিত করেছেন।

১৮৭ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পের আওতায় পলিনেট হাউস ছাড়াও কৃষকদের ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে ১০,৭৩৩টি কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বগুড়া ও রাজশাহীতে সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি চারতলা ভবনের তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, কৃষকেরা পরিশ্রম করতে চান না এবং পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন না। নিম্নমানের সামগ্রীর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এটি আঙুর চাষের জন্য টেকসই প্রযুক্তি এবং কৃষকদের এখন আঙুর চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, পাঁচ বছরের প্রকল্পে ঠিকাদার এক বছর ফ্রি সার্ভিস এবং তিন বছর পলিথিন মেরামতের দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন কৃষকদের নিজেদেরই এটি চালাতে হবে।

অন্যদিকে, রাজশাহীর পবার সারোয়ার হোসাইনের পলিনেট হাউসটি ঝড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। মেরামত করতে ৭০-৮০ হাজার টাকা লাগবে। ইতিপূর্বে ৫ লাখ টাকা লোকসান করায় সরকারি খরচে এটি মেরামতের জন্য আবেদন করেও তিনি কোনো সাড়া পাননি।

এ বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক বলেন, শীতপ্রধান দেশে ঠান্ডার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পলিনেট হাউস কার্যকর হলেও গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল ফসলের উপযোগী রাখা জরুরি। একেকটি ফসলের জন্য আলাদা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার হলেও আমাদের দেশে সব ফসলের জন্য একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মূলত এই কারিগরি ত্রুটির কারণেই প্রকল্পটি সফল হচ্ছে না।