আসামি গ্রেপ্তার হলেও থামছে না হত্যাকাণ্ড, ৪ দিনে রাজধানীতে ৬ খুন

রাজধানীতে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও গোলাগুলির ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত মাত্র চার দিনে রাজধানীতে ছয়টি খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং দুটি স্থানে গোলাগুলি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত তৎপরতা দেখিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও, অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল গ্রেপ্তারই অপরাধ দমনের একমাত্র সমাধান নয়। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বিচারপ্রক্রিয়াও দ্রুত করতে হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত কেবল ঢাকাতেই ১২২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাইকারীর টানে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন নিহতের ঘটনা, কলাবাগানে মা-মেয়ে (স্ত্রী ও শাশুড়ি) হত্যা এবং সবুজবাগে বিএনপিকর্মী ইব্রাহীম পলাশ হত্যাকাণ্ডসহ প্রায় সব বড় ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত শুক্রবার সকালে বনানী থানার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ইসমাইল হোসেন (৫০) নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। জামালপুর থেকে গাজীপুর আসার পথে বাসের ভাড়া দেওয়ার সময় তার কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা দেখে ফেলে বাসের সুপারভাইজার। সেই টাকা লুট করতে তাকে হত্যা করে লাশ এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় বাসচালক সোহেল রানা (৪০), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৮) এবং হেলপার মোহাম্মদ মনির হোসেন (১৮)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই দিন ডেমরায় দেলোয়ার হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে ইট দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়।

শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা হাউজিং এলাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অটোরিকশা রাখা নিয়ে একটি গ্যারেজের মালিককে মারধরের ঘটনা প্রতিহত করতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। প্রাইভেটকারে থাকা হামলাকারীদের সঙ্গে আলতাফ ও তার ছেলে আরিফুলের বাকবিতণ্ডা হলে একপর্যায়ে তিনি নিজের পুলিশ পরিচয় দেন। এতে হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে আলতাফ তার ছেলের পোশাক কারখানায় আশ্রয় নিলেও হামলাকারীরা গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেশি অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে তাদের মারধর করে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় মূলহোতা জহিরুল ইসলামসহ মোট ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ।

শনিবার সন্ধ্যায় দারুসসালামের মসজিদ গলি এলাকায় মাদকাসক্ত আব্দুল মান্নান (৪৫) পারিবারিক কলহের জেরে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারকে গুলি করেন। গুলিটি তার ডান বাহুতে লাগে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তার ছেলে জানালা দিয়ে দুর্বৃত্তদের গুলির নাটক সাজালেও তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসে। এ ঘটনায় স্বামী আব্দুল মান্নান, ছেলে মো. রাকিব (২৫) এবং সহযোগী মো. হাতিম মিয়া (২১)-কে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। একই রাতে শনিরআখড়া রয়েল হাসপাতালের সামনে ‘লাকী কুকারিজ’ দোকানে ঢুকে ব্যবসায়ী আসলাম খানকে (৪০) গুলি করে সন্ত্রাসীরা। স্থানীয়রা ধাওয়া করে দুই পিস্তল ও গুলিসহ মঞ্জুরুল ইসলাম ওরফে মঞ্জু নামে এক সন্ত্রাসীকে ধরে পুলিশে দেয়। পরে পুলিশ ইকবাল হোসেন কালু নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে।

রবিবার সবুজবাগের আদর্শপাড়া বড়ইতলা ব্রিজ এলাকায় প্রেমিকা নাজিফা শেখ নেহার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সাবেক প্রেমিক সাজিদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সিফাত উল্লাহ (২৭)। নেহা ও সাজিদ আগে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ঘর ভাড়া নিলেও পরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে কাপড়ের অনলাইন ব্যবসার সূত্র ধরে সিফাতের সঙ্গে নেহার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় এবং তাদের বিয়ের কথাবার্তাও চলছিল।

রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে শরিফের রিকশা গ্যারেজে আড্ডার সময় মো. ইমরান (৩২) নামের এক যুবককে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে হেলমেট পরা ৬-৭ জন দুর্বৃত্ত। এ সময় জাকারিয়া (৩৩) নামের আরেক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। সোমবার রাত ১টার দিকে মিরপুর শাহআলী এলাকায় টাকা লেনদেনের বিরোধে মেহেদী হাসান (২৬) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। স্থানীয়রা ছুরিসহ ঘাতক মাহবুবুর রহমানকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেহেদীর মৃত্যু হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, ঢাকাকে নিরাপদ রাখতে টহল, পেট্রোলিং ও সাদা পোশাকে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব কার্যক্রম তদারকি করছেন। অপরাধ ঘটার আগেই সাধারণ মানুষ পুলিশকে তথ্য দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, কেবল গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়। দ্রুত তদন্ত, নির্ভুল চার্জশিট এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে বা আসামিরা সহজে জামিন পেয়ে গেলে আইনের প্রতি ভয় কমে যায়, যা অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়াতে উৎসাহিত করে।