১৭৩২ সালে পর্তুগালের লিসবনে যাত্রা শুরু করেছিল একটি বইয়ের দোকান। সময়ের নানা চড়াই-উতরাই, ভূমিকম্প, রাজতন্ত্রের পতন আর বিপ্লব পেরিয়ে আজ প্রায় তিন শতক ধরে সগৌরবে টিকে আছে সেটি। নাম তার ‘লিভরারিয়া বের্ত্রাঁ’ (Livraria Bertrand)। ২০১১ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সচল বইয়ের দোকান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লিসবনের চিয়াদো এলাকার রুয়া গারেত নামক একটি ঐতিহাসিক রাস্তায় অবস্থিত এই দোকানটি কেবল বই বিক্রির জায়গা নয়, বরং এটি পর্তুগালের সাহিত্যের জীবন্ত ইতিহাস।
ফরাসি বংশোদ্ভূত বই ব্যবসায়ী পেদ্রো ফাওরে ১৭৩২ সালে লিসবনের রুয়া দিরেইতা দো লোরেতো এলাকায় এই দোকানটি প্রথম চালু করেন। ১৭৪০-এর দশকে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন আরেক ফরাসি বই ব্যবসায়ী পিয়ের বের্ত্রাঁ। দুই পরিবারের এই মেলবন্ধনের পর দোকানটি ধীরে ধীরে বের্ত্রাঁ পরিবারের নামে পরিচিতি লাভ করে এবং লিসবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথ সহজ ছিল না। ১৭৫৫ সালের ১ নভেম্বর লিসবনে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার সঙ্গে যোগ হয় সুনামি ও অগ্নিকাণ্ড। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বের্ত্রাঁর আদি ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু বইয়ের এই গল্প সেখানেই থেমে থাকেনি। সাময়িকভাবে অন্য স্থানে কার্যক্রম পরিচালনার পর, লিসবন পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ১৭৭৩ সালে এটি রুয়া গারেতের বর্তমান ঠিকানায় ফিরে আসে। এই স্থানটি কেবল একটি দোকানের পুনর্জন্মেরই নয়, বরং পুরো শহরের ঘুরে দাঁড়ানোর সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
ধীরে ধীরে বের্ত্রাঁ হয়ে ওঠে পর্তুগালের বিখ্যাত লেখক, কবি ও চিন্তাবিদদের আড্ডাস্থল। আলেকজান্দ্রে এরকুলানো, এশা দে কুইরোজ, আনতেরো দে কুয়েনতাল এবং রামালহো ওর্তিগাঁওয়ের মতো কিংবদন্তি সাহিত্যিকেরা এই দোকানে নিয়মিত আসতেন। এখানে কেবল বই কেনাবেচাই হতো না, বরং নতুন সব সাহিত্যিক ভাবনা ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হতো, যা আজকের আধুনিক ‘বুকস্টোর কালচার’ বা বইয়ের দোকানের সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
বিশ শতকে এসে বের্ত্রাঁ তার পরিধি আরও বাড়াতে শুরু করে। ১৯৩৮ সালে পোর্তো শহরে প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় শাখা খোলা হয়। এরপর লিসবনের অ্যাভেনিদা দে রোমায় আরেকটি নতুন শাখা চালু করা হয়। ১৯৩৯ সালে নিজস্ব মুদ্রণ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এটি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কে রূপ নেয়। বর্তমানে পর্তুগালজুড়ে বের্ত্রাঁর ৬০টিরও বেশি শাখা এবং একটি অনলাইন স্টোর রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০০ কর্মী নিয়োজিত আছেন। তবে এই বিশাল আধুনিক নেটওয়ার্কের মূল কেন্দ্র হিসেবে এখনও চিয়াদোর সেই আদি দোকানটিই সগৌরবে টিকে রয়েছে।
বের্ত্রাঁর ইতিহাসের একটি অনন্য অংশ হলো ‘আলমানাকে বের্ত্রাঁ’। ১৮৯৯ সালে প্রথম লিসবনের এক অস্থির সময়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং ১৯০০ সালের জন্য প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। পঞ্জিকা হিসেবে শুরু হলেও দ্রুতই এটি সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, কবিতা, ধাঁধা ও চুটকির এক অনন্য সংকলনে পরিণত হয়। প্রথম সংস্করণে ৫ হাজার কপি ছাপা হলেও ১৯০৮ সালে এর প্রচার সংখ্যা ১৫ হাজারে পৌঁছায়। ১৯০০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এটি পর্তুগালের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী ছিল। দীর্ঘ ৪০ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১১ সালে এটি পুনরায় প্রকাশ করা শুরু হয়। বর্তমানে ২০২৬-২৭ সালের জন্য প্রকাশিত ৮৬তম সংস্করণে পর্তুগালের সংবিধানের ৫০ বছর পূর্তি, সাহিত্যিক স্মরণিকা, কবিতা, প্রবন্ধ, কার্টুন ও ক্যালেন্ডারসহ নানা বিষয় স্থান পেয়েছে।
চিয়াদোর বর্তমান বের্ত্রাঁ দোকানটিতে এখন সাতটি কক্ষ রয়েছে, যার প্রতিটির রয়েছে নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিবেশ। ২০১৭ সালে এর সাথে যুক্ত হয় ‘ক্যাফে বের্ত্রাঁ’, যা পাঠকদের জন্য কফি পানের পাশাপাশি অবসরে বই পড়ার চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে। ২০১৯ সালে লিসবন সিটি কাউন্সিল ঐতিহ্যবাহী এই দোকানটিকে ‘লোজা কম ইস্তোরিয়া’ বা ‘ইতিহাসের দোকান’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার কারণেই আজ প্রায় তিনশ বছর পরও বের্ত্রাঁ টিকে রয়েছে বিশ্বের বুকে এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে।

