দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচি চালু থাকলেও, প্রকৃত দরিদ্রদের একটি বড় অংশই এর আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের মধ্যে প্রায় ৬৭ দশমিক ১ শতাংশই প্রকৃত দরিদ্র নন। উল্টো চিত্র হলো, যারা এই সুবিধা পাচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৮ শতাংশই সচ্ছল বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নন। এর ফলে প্রকৃত দরিদ্ররা বরাদ্দের বড় অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক এক অধিবেশনে এই বৈষম্যমূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে জিইডির সদস্য ড. মনজুর হোসেন এবং উপপ্রধান মোহাম্মদ ফাহিম আফসান চৌধুরী প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় গড় ব্যয় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে কেবল ব্যয় কম নয়, বরং বরাদ্দের লক্ষ্যভেদ বা সঠিক সুবিধাভোগী নির্ধারণেও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সালে দেশে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্যের এই ক্রমবর্ধমান চাপে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে দেশে ৯৫টি কর্মসূচি চালু থাকলেও, ছোট ৫০টি কর্মসূচি মোট বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ পায়। এই বিপুলসংখ্যক কর্মসূচির কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি, সমন্বয়হীনতা এবং নজরদারি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যেমন, বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ পড়ার হার ৮৫ শতাংশ।
শহরাঞ্চলেও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো বেশ দুর্বল। মাত্র ২৩টি কর্মসূচি শহরের মানুষের জন্য পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে মোট সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের মাত্র ৪ শতাংশ বরাদ্দ থাকে। এছাড়া বড় ধরনের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলো যাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে না পড়ে, সেজন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার ‘হেলথ প্রটেকশন ফান্ড’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, বর্তমানে ৯০টির বেশি কর্মসূচি কমিয়ে ১০টির নিচে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন সর্বজনীন করার চেষ্টা চলছে, যাতে রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ কমে। অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার ‘সিস্টেম লস’ এবং শিক্ষক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রায় ৩৮ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই এবং স্কুল-কলেজে প্রায় ৭৭ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এসডিজি অর্জনে কেবল ওষুধ নয়, রোগ প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সবশেষে জিইডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এখন কেবল বরাদ্দ বাড়ানো নয়, বরং সঠিক মানুষকে চিহ্নিত করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।

