সামরিক নেতৃত্বে বড় রদবদল ইরানের, ‘আক্রমণাত্মক অভিযানের’ প্রস্তুতি

ইরানের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল এনেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছয়জন অভিজ্ঞ কমান্ডারকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে তেহরান তার যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই রদবদলের অংশ হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদিকে মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় নিহত মোহাম্মদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হলেন। ওয়াহিদির ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মোস্তফা ইজাদি।

একই সাথে মেজর জেনারেল আলি আবদোল্লাহিকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কিয়োমার্স হেইদারিকে তার ডেপুটি করা হয়েছে। এছাড়াও রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি ওজমাইকে আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার এবং হোসেইন তাইয়েবকে সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে জানিয়েছেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া এই ছয় কমান্ডার সাম্প্রতিক দুটি চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

এর আগে সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার-ইন-চিফ মোহসেন রেজায়িকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব এবং এই শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থায় মোজতবা খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এই কাউন্সিলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের উপপরিচালক আলি ভায়েজ মনে করেন, এই নিয়োগগুলোর উদ্দেশ্য শুধু সাম্প্রতিক যুদ্ধের দুর্বলতাগুলো দূর করা নয়, বরং মোজতবার কর্তৃত্ব সুসংহত করা। পরবর্তী যেকোনো সংকটে দ্রুত ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতেই খামেনি তার অত্যন্ত আস্থাভাজন ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছেন।

আইআরজিসির নতুন কমান্ডার হিসেবে ওয়াহিদিকে সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন মোজতবা খামেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক অবস্থান আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বিবৃতিতে বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধে ওয়াহিদি আইআরজিসির নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা অনুসরণ করে এই বাহিনীকে তার পথ অব্যাহত রাখতে হবে। আলি ভায়েজের মতে, ওয়াহিদির কৌশলগত, গোয়েন্দা ও অসম যুদ্ধ পরিচালনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার এই নিয়োগের অর্থ হলো, ভবিষ্যতে ইরানে কোনো হামলা হলে তেহরান যেন আরও দ্রুত ও শক্তিশালীভাবে পাল্টা আঘাত হানতে পারে, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের নিরাপত্তা অধ্যয়নের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের প্রায় সবাই আইআরজিসির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্মের প্রতিনিধি। ওয়াহিদি আশির দশক থেকেই এই বাহিনীর সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আইআরজিসির অভিজাত কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে তিনি কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব কাসেম সোলাইমানির কাছে হস্তান্তর করেন, যিনি ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন হামলায় নিহত হন। সেলুমের মতে, এটি নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, বরং পুরোনো ও আস্থাভাজন নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক ফেলো সিনা তুসি মনে করেন, খামেনি একদিকে সর্বোচ্চ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখার কথা বলছেন, অন্যদিকে শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী আক্রমণাত্মক অভিযানের নির্দেশ দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে ইরান প্রতিরোধের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, যেখানে শুধু পাল্টা আঘাত নয়, বরং উদ্যোগ নিজের হাতে নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেয়াকেও প্রতিরোধের অংশ ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মার্চে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা হওয়া মোজতবা খামেনি এখন নিজের মতো করে যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলছেন।

এদিকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব হিসেবে মোহসেন রেজায়ির নিয়োগ ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রেজায়িকে নিয়োগের মাধ্যমে সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদরের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে, যিনি স্পিকার গালিবাফের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। রেজায়ি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তবে বিশ্লেষক সেলুম সতর্ক করে বলেন, ইরান মুখে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিলেও বাস্তবে বড় কোনো সামরিক অভিযান চালাবে এমন নয়। তাদের প্রকৃত আক্রমণাত্মক সক্ষমতা মূলত অসম যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল এবং গোয়েন্দা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ইরানের এই আক্রমণাত্মক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে।