মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলন

ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর জন্যও তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সুযোগ। মে মাস থেকেই তরুণদের ক্ষোভের জোয়ারে সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সেই সময় দলের প্রতিষ্ঠাতা জানিয়েছিলেন, তাদের সমর্থকরা শুধু মোদির সরকার নয়, বিরোধী দলগুলোর প্রতিও আস্থা হারিয়েছেন, কারণ কেউই তাদের সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।

পরিস্থিতি পাল্টে যায় সোমবার দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে মিছিলের সময়। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করলে সিজেপির নেতারা বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতাদের কাছে সরাসরি সমর্থনের আহ্বান জানান। পুলিশের অভিযানে বহু শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পরদিনই বিরোধী নেতারা আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ান। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ বিরোধী দলগুলোর জন্য তরুণ ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সিজেপি এখন পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের আন্দোলন চালিয়ে আসছে।

সোমবার দিল্লিতে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের কঠোর দমনপীড়নের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় সব বিরোধী দল আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। যদিও সিজেপি স্পষ্ট করেছে যে তারা নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেবে না। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা হলো, বিরোধী দলগুলোর সমর্থন আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিক সহায়তা ও জাতীয় পরিচিতি আনলেও, শিক্ষার্থীদের মূল দাবি—প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি—বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডার আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

২০১৪ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদি সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। তবে ভারতের ১৪২ কোটির বেশি জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না হওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। দিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার মনে করেন, অন্তত এই ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত তৈরি হয়েছে, যা বিরোধীরা বুঝতে পেরেছে। তবে আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকলে সরকারের কঠোর দমনপীড়নের সম্ভাবনা থেকেই যায়। সরকারপন্থী কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ইতিমধ্যে অভিযোগ তুলেছে যে বিরোধী দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিতে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

মঙ্গলবার রাতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। আটকের আগে রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে ভারতের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা। মোদি এখনো প্রকাশ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে মন্তব্য না করলেও মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই মনে করেন, উত্তর প্রদেশ ও পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তরুণদের সমর্থক হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সিজেপির মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা বিরোধী দলের সমর্থন স্বাগত জানালেও সেখানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকা- হতে দেবেন না। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সন্দীপ শাস্ত্রী সতর্ক করে বলেন, যে কোনো আলোচিত আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর যোগ দেয়ার প্রবল প্রলোভন থাকে। কিন্তু তারা বেশি সক্রিয় হয়ে গেলে আন্দোলনের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও মূল দাবিগুলোই শেষ পর্যন্ত আড়ালে চলে যেতে পারে।