পুলিশের অন্দরে অস্থিরতা, বদলি বাণিজ্য নিয়ে তোলপাড়

পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালার (পিআরবি) ইচ্ছামতো সংশোধনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন চার হাজার এএসআই পদ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি ও ৫০ ভাগ সরাসরি নিয়োগের নিয়ম মানা হলেও, সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ পদদলিত করা হয়েছে। পিআরবি সংশোধন করে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চালু করায় দীর্ঘদিন ধরে যোগ্যতার ভিত্তিতে এএসআই থেকে এসআই হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে, যা মাঠপর্যায়ে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

একজন অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, অর্থের বিনিময়ে পদ দখল করায় কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ করা টাকা তোলা। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের কাছে এখন গৌণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অধস্তনদের আস্থা কমে গেছে। তারা ভাবছেন, অতীতে সংকটের সময় যেমন শীর্ষ কর্মকর্তারা পালিয়ে গিয়ে নিজেদের বাঁচিয়েছেন, তেমনি বর্তমান নেতৃত্বও সংকটকালে একই কাজ করবে। এই আশঙ্কায় অধস্তনরা নিজের দায় নিয়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, পুলিশের মতো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর অভ্যন্তরে এভাবে ক্ষোভ, অনিয়ম, ঘুসবাণিজ্য এবং পদায়ন নিয়ে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনো সম্ভব হবে না। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সা ও অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনশেষে কিন্তু সরকারকেই এর খেসারত দিতে হবে।

এদিকে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, বদলি এবং পদায়ন নিয়ে গত কয়েক মাসের গুঞ্জন ও কানাঘুষা নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) প্রটোকল বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জনৈক বডিগার্ডের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই অডিও ফাঁসের পর পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে চলতে থাকা গোপন বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের রমরমা চিত্র আবারও জনসমক্ষে চলে এসেছে, যা নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ওই অডিও রেকর্ডটিতে মূলত পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে বদলি এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের এক নগ্ন চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। রেকর্ডের প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে কীভাবে ক্ষমতার প্রভাবে বা শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে বদলিকে লাভজনক পেশায় পরিণত করেছে। অডিওতে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এসেছে যে, পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের সদস্যদের পছন্দমতো লাভজনক বা গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি করাতে গেলে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা লেনদেন করতে হয়। এই লেনদেন প্রক্রিয়ায় কার কত অংশ এবং কোন কোন মাধ্যমের হাতবদল হয়ে ফাইল ছাড় হয়, তার ইঙ্গিতও রয়েছে ফোনালাপে। পুলিশ প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ক্লোজড সার্কেল বা সিন্ডিকেট তৈরি করে মাঠপর্যায়ের বদলি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তার বিবরণও ফোনালাপে পাওয়া যায়।

এর আগে গত মে মাসের শেষ দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাশেমের বক্তব্যের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। পরে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। তার বক্তব্য ছিল, ‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস। আমরা কেউ কাউকে ঠকাব না। সবাই মিলেমিশে থাকব। ধরেন ২ হাজার টাকা আমি খরচ করলাম, এই টাকা তো আমার বাড়ির টাকা না, বেতনের টাকাও না। আপনারা একটা অভিযোগ দিলেন ১ হাজার টাকা, আরেকটা খারিজ করে দিলেন ১ হাজার টাকা। ওইটা দিয়েই কিন্তু আমি পার করে দিলাম। তাইলে আমার তো রিস্ক নাই, নো টেনশন, খুব রিলাক্সে আছি।’ ওই রেকর্ডে ওসিকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘পুলিশের চাকরিটা এক ধরনের ব্যবসা। সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না, তবে আমরা একজন আরেকজনকে সুরক্ষায় রাখছি। সবাই সমন্বয় করে চলতে হবে। ওসির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে পারবেন না। আমি আপনাদের ঠকাব না। আমার কনস্টেবলরা যেন তাদের প্রাপ্য পায়, তারা যেন বঞ্চিত না হয়। হক মারা আমি পছন্দ করি না।’ এছাড়া অডিওতে মামলাসংক্রান্ত অর্থ লেনদেন, থানার অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তার কোনো সত্যতা নেই। বর্তমান আইজিপির বিরুদ্ধে পুলিশের ভেতরে একটি গ্রুপ সক্রিয় আছে। তারা নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আইজিপির বডিগার্ডের অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন ইন্সপেক্টর আইজিপির বডিগার্ডকে ফোন করেছিলেন। ওই বডিগার্ড ইতঃপূর্বে আমার বডিগার্ড হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই ইন্সপেক্টর আইজিপির মাধ্যমে নিজের কোনো তদবির করানোর জন্য বডিগার্ডকে বারবার অনুরোধ করছিলেন। কারণ তারা পূর্বপরিচিত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে বডিগার্ড যখন তাকে স্পষ্ট জানান যে, এমন কোনো তদবির করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তখন বিশেষ উদ্দেশ্যে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। তিনি বলেন, বডিগার্ডের কথায় বদলির সুযোগ নেই।