ইউপি নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে ২৪৩ শতাংশ, মোট খরচ ৩ হাজার কোটি

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে পরিচালনা খাতে খরচ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, বিগত ২০২১ সালের তুলনায় এবার এই খাতে ব্যয় বাড়ছে প্রায় ২৪৩ শতাংশ। সে সময় যেখানে ৪৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল, এবার একই খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংস্থানসহ সব মিলিয়ে আসন্ন এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মোট ব্যয় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে জানা গেছে।

আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ৩,৯৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে ভোট সম্পন্ন করতে হলে ইসিকে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এ নিয়ে সরকারের ওপর প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে ইসি জানিয়েছে তারা প্রস্তুত। তফসিল ঘোষণার আগে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সংলাপ না হলে চলতি মাসেই তফসিল ঘোষণা হতে পারে। সম্প্রতি ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানান, নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি শেষপর্যায়ে রয়েছে।

দেশে মোট ৪,৫৮১টি ইউপি রয়েছে, যার মধ্যে ৩,৯৮১টিতে চলতি বছরেই ভোট করতে হবে। তবে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে শিক্ষা সূচি ও ধর্মীয় উৎসবের বিষয়টি মাথায় রাখতে হচ্ছে। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুলগুলোয় বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, যা কমিশনের জন্য একটি বড় সমন্বয়গত চ্যালেঞ্জ।

এর আগের ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মোট সাতটি ধাপে। প্রথম ধাপে ৩৬৮টি, দ্বিতীয় ধাপে ৮৪০টি, তৃতীয় ধাপে ১,০০০টি, চতুর্থ ধাপে ৮৩৭টি, পঞ্চম ধাপে ৭০৮টি, ষষ্ঠ ধাপে ২১৬টি এবং সপ্তম ধাপে ১৬৩টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ করা হয়। এছাড়া বিশেষ বা অষ্টম ধাপে আরও ৯টিসহ মোট ৪,১১৪টি ইউপির ভোট শেষ করতে ইসির সময় লেগেছিল ১৯৬ দিন বা প্রায় ছয় মাস। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। তাই এবার ধাপে ধাপে নির্বাচনের সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করছে ইসি।

নির্বাচন পরিচালনা খাতের প্রস্তাবিত ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের বেষ্টনী নির্মাণ, ভোটকক্ষ প্রস্তুত, মেরামত, গোপন কক্ষ তৈরি ও অস্থায়ী কেন্দ্র নির্মাণে এবার ৪৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বারের ১৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। আড়াই হাজার রিটার্নিং অফিসারের জন্য আগে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ব্যালট পেপার মুদ্রণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সরবরাহ, আচরণবিধি তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য executive ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ব্যয়ও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে ১২টি খাতে কোডভিত্তিক পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৪ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সম্মাননা ভাতার জন্য ৪৪৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, অন্যান্য মনিহারি খাতে ৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, যাতায়াত ভাতার জন্য ৯৬ কোটি টাকা এবং আপ্যায়ন বাবদ ৯৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রচার ও বিজ্ঞাপনে ৭ কোটি, মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ে ৫০ কোটি, যানবাহন ব্যবহারে ২ কোটি, দায়িত্ব পালনকালে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪ কোটি, অনিয়মিত শ্রমিকের মজুরিতে ১৭ কোটি ১৬ লাখ, জ্বালানি খাতে ৪৬ কোটি ৬০ লাখ, দৈনিক ভাতার জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ এবং পরিবহন ব্যয়ে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশাল এই ব্যয় নির্বাহের জন্য ইসিসহ সংশ্লিষ্ট তিন বিভাগের মধ্যে শিগগিরই একটি অর্থসংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন ও আচরণ বিধিমালা সংস্কারের কাজ চূড়ান্ত করছে ইসি. গত মাসেই পাঁচটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক আচরণ বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পর চূড়ান্ত খসড়া সরকারের কাছে পাঠাতে চায় ইসি। তফসিল ঘোষণা নিয়ে কমিশনারদের মধ্যে কিছুটা সমন্বয়হীনতা ও তথ্য লুকোচুরির কারণে বিভ্রান্তিকর খবরও ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে। দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। ভোটার স্থানান্তরের আবেদন ৭ সেপ্টেম্বর এবং নিষ্পত্তি ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করে চূড়ান্ত তালিকা মুদ্রণে যাবে কমিশন।

একই ভাবে আড়াই হাজার রিটার্নিং অফিসারের জন্য আগে বরাদ্দ ছিল তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এবার কর্মকর্তাপ্রতি ৫০০ টাকা বাড়িয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে চার কোটি ৪০ লাখ টাকা। ব্যালট পেপার মুদ্রণ, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স সরবরাহ, আচরণবিধি তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় কয়েকগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।