বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র আমূল বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে পর্যটন শিল্প। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, সিলেটের পাহাড় ও ঝরনা এবং উত্তরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতো অঢেল প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদে ভরপুর এই দেশ। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এত বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ এখনো শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারিনি। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) মতে, পর্যটন বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক খাতের একটি। থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো পর্যটন শিল্পের ওপর ভর করে তাদের জাতীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশ সচল রেখেছে। অথচ বাংলাদেশে জিডিপিতে এই খাতের অবদান বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা সম্পদের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
পর্যটন শিল্পের পথে প্রধান অন্তরায়গুলো হলো অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তাহীনতা, আবাসন ও যাতায়াত খরচের আধিক্য, ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণার অভাব এবং বিনোদন ও নাগরিক সুবিধার স্বল্পতা। অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা এবং মানসম্মত হোটেল বা রিসোর্টের স্বল্পতার পাশাপাশি খাবারের অযৌক্তিক উচ্চমূল্য পর্যটন শিল্পকে মুখ থুবড়ে ফেলছে। এছাড়া ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার বড় অভাব রয়েছে। পর্যটন মানে শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা নয়, এর সাথে নাগরিক বিনোদন ও সুবিধাও অতীব জরুরি।
এই খাতকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের জন্য সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে বিক্ষিপ্তভাবে পরিচালনা না করে নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোকে 'স্পেশাল ট্যুরিস্ট জোন' হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ এলাকা, সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্টসহ বিশেষ জোনে রূপান্তর করা যেতে পারে। এসব জোনে 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার' থাকবে, যেখান থেকে পর্যটকরা গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে গাইডসহ সব সেবা পাবেন।
কানেক্টিভিটি ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন পর্যটন শিল্পের জন্য অপরিহার্য। ঢাকা-কক্সবাজার রেললাইনের মতো প্রকল্পের পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোর জন্য বিশেষ 'ট্যুরিস্ট কোচ' বা 'লাক্সারি ডাইনিং ট্রেন' চালু করা যেতে পারে। নৌ-পর্যটনের জন্য আধুনিক ক্রুজ শিপের ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বিমান করিডোর শক্তিশালী করার পাশাপাশি টিকেটের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখতে বিশেষ ভর্তুকি বা কর ছাড় দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকায় ইলেকট্রিক কার বা পরিবেশবান্ধব শাটল বাস সার্ভিস চালু করা জরুরি।
বর্তমানে পর্যটন প্রযুক্তি-নির্ভর, তাই সরকারকে একটি উন্নতমানের কেন্দ্রীয় 'স্মার্ট ট্যুরিজম অ্যাপ' চালু করতে হবে। এতে ঐতিহাসিক তথ্য, মানচিত্র, ভেরিফাইড হোটেল বুকিং, রিয়েল-টাইম যাতায়াত সময়সূচী এবং নিকটস্থ থানার নম্বর যুক্ত থাকবে। প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ফ্রি হাই-স্পিড ওয়াইফাই এবং কিউআর কোড ভিত্তিক তথ্য বোর্ড স্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ১০০টিরও বেশি দেশের জন্য 'ভিসা অন অ্যারাইভাল' ও সহজ ই-ভিসা প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করার পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় হেল্প ডেস্কের মাধ্যমে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা জোরদার করতে হবে।
মানুষ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে আসে না, তারা আনন্দ ও বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা চায়। তাই আন্তর্জাতিক মানের থিম পার্ক, ওয়াটার পার্ক এবং ওয়াটার স্পোর্টসের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রতিটি বড় পর্যটন কেন্দ্রে 'কালচারাল ভিলেজ' গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বাঙালি ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য, লোকশিল্প এবং খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। সবশেষে, সুন্দরবন ও সেন্টমার্টিনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকদের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় 'জিরো ওয়েস্ট' পলিসি ও প্লাস্টিক মুক্ত জোন হিসেবে এলাকাগুলোকে গড়ে তোলার মাধ্যমে ইকো-ট্যুরিজম নিশ্চিত করতে হবে।
বা বলতে খুব কম দেশেরই থাকে। এই শিল্পের উন্নতির জন্য দরকার আমাদের যত্ন ও সঠিক পরিকল্পনা। এই শিল্প উন্নয়নে সবার আগে জানতে হবে সংকট কোথায়। পর্যটন শিল্পের পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে। ১. অবকাঠামোগত দুর্বলতা। ২. নিরাপত্তাহীনতা। ৩. আবাসন ও যাতায়াত খরচ। ৪. ব্রান্ডিং ও প্রচারণার অভাব। ৫. বিনোদন ও নাগরিক সুবিধার স্বল্পতা।

