জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া কেবল একটি সংখ্যা নন; তিনি হাজারো নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার সংগ্রাম ও এক প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের প্রতিচ্ছবি। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার একটি সাধারণ গ্রামে জন্ম নেয়া হৃদয়ের জীবনজুড়ে ছিল অভাবের সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ। কাঠমিস্ত্রি বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া ও হৃদরোগে আক্রান্ত মা অর্চনা রানীর দুই কক্ষের টিনের ঘরে বেড়ে ওঠা হৃদয় দারিদ্র্যকে কখনোই মেধার পথে বাধা হতে দেননি। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ অর্জনকারী হৃদয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তির পর টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা চালিয়েছেন এবং পরিবারের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় হৃদয় কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে নয়, বরং বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে রাজপথে নেমেছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হয়ে বাবার কষ্ট লাঘব করা এবং মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে একটি পাকা ঘর তৈরি করা। ১৮ই জুলাই ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে আন্দোলনের সময় গলায় ও বুকে বুলেটবিদ্ধ হন তিনি। ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তাকে প্রথমে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। পাঁচ দিনের লড়াই শেষে ২৩শে জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
হৃদয়ের মৃত্যুর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০২৫ সালে একটি বিশেষ সম্মানসূচক গ্রেডশিট প্রকাশ করে, যেখানে প্রতিটি কোর্সে নম্বর শূন্য হলেও তা ইতিহাসের বিচারে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হয়েছে। হৃদয়ের ব্যবহৃত বই ও চশমা আজও সেই পটুয়াখালীর ভাড়া বাসায় তার শূন্যতার জানান দেয়। তার বাবা রতন চন্দ্র তরুয়ার কণ্ঠে আজও ঝরে পড়ে অসহায় প্রশ্ন—এখন কার দিকে চেয়ে তিনি বাঁচবেন? হৃদয়ের আত্মত্যাগ আজ কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে। তার বিসিএস হওয়ার স্বপ্ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা আজ দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি অমর উত্তরাধিকার হয়ে আছে।

