তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারখানা ও পোশাকশিল্পে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। লোডশেডিংয়ের ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা শ্রমিকদের জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এমনিতেই গ্যাস সংকটের কারণে দেশের শত শত শিল্পকারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এর ওপর লোডশেডিং সামাল দেওয়ার অজুহাতে শিল্প খাতের বরাদ্দ থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিল্প খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর বিকল্প পথ রয়েছে। দৈনিক ৫৪ থেকে ৬০ কোটি টাকার ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ালেই শিল্পের জন্য বরাদ্দ গ্যাস কমানোর প্রয়োজন হতো না।
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এলএনজি কার্গোর অভাবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল এক সপ্তাহ ধরে অলস বসে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। বৈঠকে এলএনজি সরবরাহ যে কোনো মূল্যে অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ীতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল-এফএসআরইউ ও একটি এলপিজি টার্মিনাল এবং পায়রায় একটি এফএসআরইউ বসানোর অগ্রগতি জানতে চান। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে, বিশেষ করে ১০ বছরের বিদ্যুতের চাহিদা বিবেচনা করে এখনই পরিকল্পনা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত একজন নীতিনির্ধারক জানান, গ্যাস সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন।
শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে আরও প্রকট হয়। ১৩ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ সিদ্ধান্ত নেয় যে, দৈনিক ৭২ কোটি ঘনফুট থেকে বাড়িয়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে। এই গ্যাস শিল্পকারখানা থেকে কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়, যার ফলে শত শত শিল্প ১৫ দিন ধরে কারখানা চালানোর মতো গ্যাস পাচ্ছে না। তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, অসংখ্য শিল্পমালিক গ্যাসের অভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে না পারার অভিযোগ করছেন, তবে তার কাছে আপাতত কোনো সুরাহা নেই।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় সারা দেশে মোট ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে সামিট গ্রুপের টার্মিনাল থেকে ৫৭ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ হয়েছে। তিতাস ও পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এই ২১৯ কোটি ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুতের জন্য ৯৫ কোটি ঘনফুট, সার কারখানার জন্য ২০ কোটি ঘনফুট এবং শিল্পকারখানার জন্য ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি গ্যাস সিএনজি স্টেশন, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ আগস্ট বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ ছিল। পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৪ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট। ১২ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট করা হয়। ওইদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৯৫৬ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪২৬ মেগাওয়াট ছিল। পেট্রোবাংলা ও পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট ৯৩ কোটি ১০ লাখ, ১৭ আগস্ট ৯৩ কোটি ৮০ লাখ, ১৮ আগস্ট ৯৩ কোটি ২০ লাখ এবং ১৯ আগস্ট ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই গ্যাস দিয়ে ১৪ আগস্ট সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০১ মেগাওয়াট, ১৮ আগস্ট ৫ হাজার ৪২৪ মেগাওয়াট এবং ১৯ আগস্ট ৫ হাজার ২০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অর্থাৎ ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বেশি পেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর (উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি) বড় অংশ অলস বসে আছে। ১৯ আগস্ট রাত ১১টায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট এবং বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় ১ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলা ও পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, সরকার চাইলে এই কেন্দ্রগুলো থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ নিতে পারে। ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের পরিবর্তে ফার্নেস অয়েল দিয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতিদিন বাড়তি ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা খরচ হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, শিল্পকে বাঁচাতে সরকারকে এই মুহূর্তে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা উচিত, অন্যথায় অর্থনীতির বড় ক্ষতি হবে।
এমনিতেই গ্যাস সংকটে দেশের শত শত শিল্পকারখানা বন্ধের উপক্রম। তারপরও লোডশেডিং সামাল দেওয়ার নামে শিল্প খাতের বরাদ্দ থেকে ২০-২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিল্প খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্পকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পথ আছে। দৈনিক ৫৪ থেকে ৬০ কোটি টাকার ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ালেই শিল্পের জন্য বরাদ্দ গ্যাস কমানের প্রয়োজন হতো না।
অর্থাৎ ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বেশি পেয়ে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। পিডিবি জানিয়েছে, মূলত বন্ধ আশুগঞ্জ দক্ষিণ ও পূর্ব ইউনিট, শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট এবং মেঘনাঘাট কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জসহ কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।

