ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন নতুন করে চাপ বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই কৌশল তেহরানকে নতি স্বীকার করানোর পরিবর্তে উল্টো আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাদের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক সংকট যত গভীর হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিপরীতে পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিও তত বাড়ছে।
ইরানের নেতৃত্ব অবশ্য নতুন এই অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে ওঠার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। তবে এর বিনিময়ে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে সংঘাতের মূল্য আরও বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিনা তৌসি বলেছেন, ওয়াশিংটন যত বেশি তৃতীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করবে, ততই তেহরানের সামনে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রণোদনা বাড়বে। ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়ায় যারা অংশ নেবে, তাদেরও যে মূল্য দিতে হবে, সেটিই দেখাতে চাইতে পারে তেহরান।
কয়েক মাস ধরে সরাসরি সামরিক সংঘাত কিছুটা কমলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের লড়াই অনেকটা অর্থনৈতিক ধৈর্যের পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট ব্যাসেন্ট সোমবার ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ঘোষণার সময় জানান, এগুলো দেশটির অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে। তবে এই চাপ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন এই অভিযানকে সামরিক পরিভাষায় 'ইকোনমিক ডি-ডে' হিসেবে অভিহিত করছে।
তেহরানও এর প্রতিক্রিয়ায় কঠোর সামরিক ভাষায় কথা বলছে। ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীর লজিস্টিক বিভাগের প্রধান মাজিদ ইবন আল-রেজা মঙ্গলবার বলেন, মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপর এই চাপ যুদ্ধেরই অংশ, তাই জনগণকে রক্ষায় তারাও যুদ্ধের ক্ষেত্র বাড়াবেন। ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে যোগ দেয়, তবে অঞ্চল থেকে 'এক ফোঁটা তেলও' বের হতে দেওয়া হবে না এবং এসব দেশকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইরানের তেলমন্ত্রী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে গেছে। প্রভাবশালী সংবাদপত্র দোনিয়া-ই-এঘতেসাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান ৪১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলেছে, যেখানে কিছু ওষুধের দাম ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সংকটও প্রকট রূপ নিয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বিবিসির ফারসি ভাষার সেবায় পেট্রলপাম্পে জ্বালানি না পেয়ে হতাশ ইরানিদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
তবুও ইরানের অর্থমন্ত্রী আলি মাদানিজাদেহ দাবি করেছেন, নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তাদের দুই বছরের একটি গোপন পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন এই মার্কিন উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করছে তুরস্ক, ইরাক, রাশিয়া ও চীনের মতো প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের অবস্থানের ওপর। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিষেধাজ্ঞা মানলেও কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা গোপন বাণিজ্য নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আঘাত হেনে দেশটির সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মার্কিন সক্ষমতাও অনেকটাই নিঃশেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
২০১৯ সালেও ইরানে জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল।

