সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি কার্গোও আগস্ট মাসে দেশে না পৌঁছানোয় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে সরকার। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি না পাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত দাম বাড়তে থাকায় দেশের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার দরপত্র ডেকেও পর্যাপ্ত সাড়া মিলছে না, উল্টো প্রতি কার্গো কিনতে গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বাড়তি টাকা।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের তিনটি এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দুটি এলএনজি কার্গো কিনতে গত ১৭ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৩-২৪ আগস্ট ও ৪-৫ সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গোর জন্য ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) প্রতি ইউনিটে ২২ ডলারের কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। বাকি তিনটি কার্গোর জন্য ১৮ আগস্ট পুনরায় দরপত্র ডাকলে ১-২ সেপ্টেম্বরের কার্গোর জন্য ২৪ ডলারের নিচে দর দিয়ে সৌদি আরামকো সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়। এরপর ১৯ আগস্ট বাকি দুটি কার্গোর জন্য তৃতীয় দফা দরপত্র ডাকা হলে ২৬-২৭ আগস্টের কার্গোর জন্য বিপি ২৫ দশমিক ৩১ ডলার দরপ্রস্তাব করে। তবে ২৯-৩০ আগস্টের কার্গোটির জন্য দর আরও বেশি আসায় তা না কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এদিকে সেপ্টেম্বরের জন্য আরও তিনটি কার্গো আমদানিতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এলএনজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গত ছয় মাসে এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট মার্কেটে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ থেকে ১১ ডলার, যা এপ্রিলে ১৪-১৫ ডলার এবং জুলাইয়ের শেষে ২২ ডলারে পৌঁছায়। জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং শীতের প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপের বাড়তি চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১ ডলার বাড়লে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হয় ৪১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ফলে ৪ ডলার বাড়তি দামে কিনতে গিয়ে এক একটি কার্গোর পেছনে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে অন্তত ১৬৫ কোটি টাকা।
এর আগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০ থেকে সাড়ে ২১ ডলার মূল্যের তিনটি এলএনজি কার্গোর অনুমোদন দেয়নি। কম দামে কেনার আশায় সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে বেশ কিছু কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হলেও আগস্টে আসার কথা থাকা চারটি কার্গোর একটিও দেশে আসেনি। এই ঘাটতি পূরণে এখন বাধ্য হয়ে উচ্চ মূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান জানান, বর্তমানে যতটুকু এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বাড়তি কার্গো আনার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।
দেশে গত ৯ বছর ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমতে থাকায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি ও দেশীয় সামিট গ্রুপের দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সরবরাহ ব্যাহত হয়। পরে ১৫ আগস্ট সামিট ও এক্সিলারেট আংশিক চালু হলেও এলএনজির অভাবে ১৯ আগস্ট এক্সিলারেটের সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার নতুন একটি কার্গো আসার পর পুনরায় সরবরাহ শুরু হলেও সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। কিন্তু এক মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক নেমে এসেছে। গত রবিবার সন্ধ্যায় এলএনজি থেকে ৭৫ কোটি ঘনফুটসহ মোট ২৩৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সেখান থেকে নিয়মিত সরবরাহ মিলছে না।
এ বিষয়ে জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, বর্তমানের চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। সরকারকে এখন গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সেই গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা যেতে পারে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সরকারের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

