রাঙামাটিতে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতন ও বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় মো. আরমান হোছাইন (২৯) নামের এক ব্যক্তিকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রোববার (২৩ আগস্ট ২০২৬) বিকেলে রাঙামাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত থাকায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার নথি ও আরজি থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী পাঁচ লাখ টাকা দেনমোহরে মিনুয়ারা আক্তারের (৩০) সঙ্গে আরমান হোছাইনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি সন্তানও রয়েছে। বিয়ের ৫-৬ মাস পর থেকেই আরমান ও তার পরিবারের সদস্যরা যৌতুকের জন্য মিনুয়ারাকে চাপ দিতে শুরু করেন। সংসার টিকিয়ে রাখতে মিনুয়ারা তার বাবার বাড়ি থেকে কয়েক দফায় মোট ৫ লাখ ৮ হাজার টাকা এনে দেন। এরপরও আরমান বিদেশে যাওয়ার কথা বলে আরও দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন।
দাবিকৃত অতিরিক্ত টাকা দিতে না পারায় মিনুয়ারাকে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি সন্তানকে নিয়ে তার ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রয় নেন। এরপরও সংসার করার চেষ্টা করা হলে স্বামীর পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, দুই লাখ টাকা না দিলে তাকে ঘরে নেওয়া হবে না। ২০২৩ সালের ৫ জুন আরমান তার স্ত্রীর ভগ্নিপতির বাড়িতে আসেন। পরবর্তীতে ১২ জুন সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে মিনুয়ারা তাকে সংসার করার অনুরোধ করলে আরমান আবারও টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আরমান তাকে এলোপাতাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মারেন। এমনকি চুলে ধরে মাটিতে ফেলে বুকে ও পেটে লাথি মারার অভিযোগও রয়েছে। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে মিনুয়ারাকে উদ্ধার করেন।
স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে থানায় মামলা করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন মিনুয়ারা। পরে ন্যায়বিচারের আশায় তিনি রাঙামাটির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি নারী ও শিশু মামলা নম্বর-৬৬/২৩ হিসেবে নথিভুক্ত হয়, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১১(গ)/৩০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আরমানকে এই সাজা দেন।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বাদী মিনুয়ারা আক্তার বলেন, "আমি আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞ। দীর্ঘদিন পর আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট।" রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মাকসুদা হাবিবের আন্তরিকতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, সরকারি কৌঁসুলির আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আদালতের ন্যায়বিচারের কারণে তিনি তার অধিকার ফিরে পেয়েছেন। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সমাজে যৌতুক ও নারী নির্যাতন কমাতে ভূমিকা রাখবে।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মাকসুদা হক বলেন, যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী সাজা দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই রায় সমাজে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে।

