দুনিয়ার জীবন মুমিন বান্দার জন্য এক পরীক্ষাস্থল। এখানে মানুষ নানা সময়ে দুর্ঘটনা, রোগবালাই ও বিপদের সম্মুখীন হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ এই বাণীর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, পার্থিব জীবনের প্রতিটি কষ্ট ও দুর্ঘটনা মূলত মানুষের ঈমান, তাকওয়া ও ধৈর্যের পরীক্ষা।
যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় পতিত হলে মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধারণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই ধৈর্যের অনন্য মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। বোখারি শরিফের ৫৬৪১ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, একজন মুসলমান যখন কোনো কষ্ট, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়, এমনকি তার শরীরে সামান্য একটি কাঁটাও বিঁধে, আল্লাহ তার বিনিময়ে বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। এই সান্ত্বনাদায়ক ঘোষণা প্রমাণ করে যে, বিপদের কষ্ট পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করে।
মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষ নবী-রাসুলগণও কঠিনতম পরীক্ষা ও দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। সুরা আনকাবুতের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, ‘আপনি কি মনে করেন যে, আপনি ঈমান আনবেন এবং পরীক্ষা করা হবে না?’ যেমন হজরত ইউসুফ (আ.)-কে তাঁর ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করেছিল। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন রোগে ভুগেছেন, হারিয়েছেন তাঁর সব সন্তান ও অঢেল সম্পদ। স্বয়ং শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে উহুদ যুদ্ধ, তায়েফের রক্তাক্ত ঘটনা এবং প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও স্নেহময় চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরীক্ষা এসেছে।
দুর্ঘটনা বা বিপদের সময় একজন মুমিন মুসলমানের করণীয় সম্পর্কে ইসলাম সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। প্রথমত, যেকোনো বিপদে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করা সুন্নত, যা সুরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধৈর্য ও সালাত কায়েম করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও’ (সুরা বাকারা : ৪৫)। তৃতীয়ত, আল্লাহর ফয়সালার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। সাময়িকভাবে আমরা দুর্ঘটনার কারণ বুঝতে না পারলেও মুমিন বিশ্বাস করে আল্লাহর সব সিদ্ধান্তের পেছনেই কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে। চতুর্থত, বেশি বেশি দোয়া করা। কারণ তিরমিজি শরিফের হাদিস অনুযায়ী, দোয়ার মাধ্যমে ভাগ্যও পরিবর্তন হতে পারে।
মূলত বিপদ বা দুর্ঘটনা মানুষের জন্য কখনো শাস্তি হতে পারে, আবার কখনো তা আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে আসে। পাপাচারের কারণে নেমে আসা বিপদ যেমন শাস্তি, তেমনি ধৈর্যশীল ঈমানদারের জন্য তা আল্লাহর বিশেষ রহমত। সহিহ মুসলিমের ২৯৯৯ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) মুমিনের এই বৈশিষ্ট্যকে আশ্চর্যজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণকর। সুখে থাকলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর বিপদে পড়লে সে ধৈর্য ধারণ করে, যা তার জন্য কল্যাণকর হয়।
ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে দুর্ঘটনা যখন সামাজিক রূপ নেয়, তখন সমাজের মানুষেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের চিকিৎসায় ও পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা আবশ্যক। একই সঙ্গে সড়ক শৃঙ্খলা ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। এছাড়াও সমাজে সমষ্টিগত গুনাহের কারণে আল্লাহর গজব নেমে আসতে পারে, তাই বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। পরিশেষে বলা যায়, যেকোনো দুর্ঘটনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে ধৈর্য, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বাড়ালে তা আমাদের জন্য জান্নাতের সোপান হয়ে উঠবে।

