আফগানিস্তানের বাদাখশানে সোনা উত্তোলনের হিড়িক ও পরিবেশের বিপর্যয়

আফগানিস্তানের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশের পাহাড়গুলোতে এখন ডজনখানেক খননযন্ত্র বা এক্সক্যাভেটর দিনরাত কাজ করছে। একসময় যেখানে গ্রামবাসী ও তাঁদের গবাদিপশু অবাধে বিচরণ করত, সেখানে এখন সোনা উত্তোলনের জন্য কয়েক হাজার খনিশ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। প্রাদেশিক রাজধানী ফয়জাবাদ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তর–পূর্বের শিওয়া এলাকায় এই কার্যক্রম চলছে, যেখানে শ্রমিকেরা বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর জন্য সোনা তুলছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আমিন জানান, আগে এই এলাকার নদীটি গভীর ও স্বচ্ছ ছিল, কিন্তু এখন খননকাজের ফলে তা পান করার বা ব্যবহারের উপযোগী নেই। নদীর তীরের ঘাস বিলীন হয়ে গেছে এবং ধুলোবালি ও বাতাসের কারণে চাষাবাদও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মোহাম্মদ আমিন তাঁর নিজের জমি একটি খনি কোম্পানির কাছে ইজারা দিয়েছিলেন ২০ হাজার ডলারের বিনিময়ে, কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থের অর্ধেক পেয়েছেন এবং জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করা হয়নি। তাঁর ছাগল পালনের সক্ষমতাও কমে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর থেকে আফগানিস্তানে শত শত খনিসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে এবং এ খাতে বার্ষিক ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটছে। তালেবান কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে খনি খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ করছে। বাদাখশানের খনি বিভাগের প্রধান আবদুল মাতিন রহিমজাই জানান, সেখানে ৬৫০ থেকে ৭০০টি কোম্পানি নিবন্ধিত হয়েছে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় কাবুলের বাসিন্দা মোহাম্মদ আগা খাজা খাইল বা শফিউল্লাহ এহসাসের মতো শ্রমিকেরা দূরদূরান্ত থেকে এসে এখানে কাজ করছেন। তিনি ট্রাকে মাল বোঝাইয়ের কাজ করে মাসে ১০ হাজার আফগানি (প্রায় ১৫০ ডলার) আয় করেন। খননযন্ত্রের বিকট শব্দের মধ্যে কাজ করে যাওয়া ২১ বছর বয়সী ওই যুবক বলেন, ‘এটি অন্য যেকোনো কাজের চেয়ে ভালো।’ খনি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় বলছে, তারা এই খাতটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এবং তাখারসহ উত্তরাঞ্চলে কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিগুলোকে প্রতি হেক্টর জমির জন্য প্রতি মাসে ২০ গ্রাম সোনা বা সমপরিমাণ নগদ অর্থ কর দিতে হয়।

তবে এই খনিগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবস্থাপক মোহাম্মদুল্লাহ মোবারিজ জানান, তাঁদের কোম্পানি সপ্তাহে ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম সোনা তুললেও বিনিয়োগ ও ব্যয়ের কারণে এখনো লোকসানে রয়েছে। এএফপির সঙ্গে কথা বলা খনিশ্রমিকদের মতে, প্রতি গ্রাম সোনার বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ১১৮ ডলার। গত বছর বাদাখশান থেকে সরকার ১১২ কিলোগ্রাম সোনা সংগ্রহ করেছে। তবে গত বছর অধিকাংশ খনি নিবন্ধিত ছিল না এবং সেগুলো থেকে ফি বা রাজস্ব আদায়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না বলে জানান রহিমজাই। পরিবেশ ও অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে ২২৫টি খনি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রহিমজাই জানান, শিওয়া এলাকায় সেতু, দোকানপাট ও স্কুল বন্যার পানি ও কাদার নিচে চাপা পড়েছে। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা নিরাপত্তার ঝুঁকি ও পরিবেশের ক্ষতির কারণে এই খনি কার্যক্রমের বিরোধিতা করছেন।