জুতা সেলাইয়ের ফাঁকে ছেলেকে পড়াশোনা করান বাবা

মানিকগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণের ব্যস্ত সড়কজুড়ে আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও পথচারীদের আনাগোনা। এই কোলাহলপূর্ণ পরিবেশেই ফুটপাতে বসে প্রতিদিন জুতা সেলাই করেন সাগর রবিদাস। তাঁর কাজের সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে সুই-সুতা, হাতুড়ি, কালির পাত্র আর পুরোনো জুতা। তবে তাঁর এই কর্মক্ষেত্রটি কেবল জীবিকা অর্জনের জায়গা নয়, বরং এটি তাঁর ছয় বছর বয়সী সন্তান প্রিয়জিৎ রবিদাসের কাছে একটি ‘দ্বিতীয় পাঠশালা’।

প্রায় সাত বছর ধরে সাগর রবিদাস আদালত প্রাঙ্গণে এই পেশায় নিয়োজিত। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ছেলেকে পড়া বুঝিয়ে দেন। প্রিয়জিৎ মানিকগঞ্জ শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের সময়ের বাইরে সে বাবার পাশেই বসে পড়াশোনা করে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দেখা যায়, ছেলের খাতা খুলে সাগর তাকে বাংলা বর্ণমালা ও সংখ্যা লেখা শেখাচ্ছেন। ছেলের পড়াশোনার অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখেমুখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না হলেও, সাগর রবিদাস শিক্ষার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। স্থানীয় মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি কিছুটা অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি ছেলেকে পড়াতে চেষ্টা করেন। কোনো কিছু প্রিয়জিৎ বুঝতে না পারলে তিনি স্কুলের শিক্ষক বা পরিচিতদের সহায়তা নেন। সাগর বলেন, অভাবের কারণে নিজে পড়াশোনা করতে না পারার কষ্ট তিনি বোঝেন, তাই ছেলেকে শিক্ষিত করে বড় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান।

পরিবার নিয়ে সাগর রবিদাস থাকেন জেলা শহরের পশ্চিম দাশড়া লঞ্চঘাট এলাকার একটি কলোনিতে। শনিবার (১ আগস্ট) দেখা যায়, ঘিঞ্জি পরিবেশে একটি আধা পাকা ঘরের দুটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে স্ত্রী শিল্পী রবিদাস ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। শিল্পী রবিদাস গৃহস্থের কাজ করেন। কলোনির মাতবর বিরেন রবিদাস জানান, জুতা সেলাইয়ের বর্তমান আয়ে সংসার চালানো কঠিন, বিশেষ করে প্রাইভেট পড়ানোর মতো বাড়তি খরচ বহন করা তাঁদের জন্য কষ্টসাধ্য।

প্রিয়জিৎ জানায়, সে বড় হয়ে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করতে চায়। তবে যাতায়াতের সমস্যার কথা উল্লেখ করে সে একটি সাইকেলের প্রয়োজনীয়তার কথা জানায়। আদালত প্রাঙ্গণে নিয়মিত আসা আইনজীবী ও সহকারীরা প্রায়ই এই বাবা-ছেলেকে একসাথে দেখেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪–এর সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আইনজীবী এ এইচ এম মাহফুজ বলেন, সাগরের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও সন্তানের শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ অনুকরণীয়। মানিকগঞ্জ শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমানও নিশ্চিত করেন যে, সাগর শিক্ষিত না হলেও সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন।