পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বোয়ালমারীর সুস্বাদু বিলাতি গাব

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গ্রামীণ জনপদে একসময় সুপরিচিত বিলাতি গাব গাছ এখন বিলুপ্তির পথে। অপরিকল্পিতভাবে গাছ কেটে ফেলা, নতুন চারা রোপণে অনাগ্রহ এবং আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে মিষ্টি ও সুস্বাদু এই ফলটি এখন আর আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না। সম্প্রতি বোয়ালমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি গাছে গোলাপি রঙের বিলাতি গাব শোভা পাচ্ছে, যা পথচারীদের নজর কাড়ছে। তবে আগের চেয়ে এই গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

বোয়ালমারী চৌরাস্তার ফলপট্টির গাব বিক্রেতা আবদুল মান্নান মোল্লা জানান, এক সময় ফরিদপুর অঞ্চলে প্রচুর বিলাতি গাব পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এটি এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “যা দু-একটি পাওয়া যায়, তার দামও অনেক। নতুন প্রজন্মও এ ফলের সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। আমাদের বাড়ির একটি গাছে ফল ধরেছে। সেগুলোই বিক্রির জন্য এনেছি। প্রতিটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”

বিলাতি গাবের পুষ্টিগুণ ও এর ক্রমবিলুপ্তির বিষয়ে কথা বলেন বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী। তিনি উল্লেখ করেন, বিলাতি গাব অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। একসময় ফরিদপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কমবেশি গাব গাছ দেখা যেত। এই গাছের জন্য বিশেষ কোনো সার বা ওষুধের প্রয়োজন না হলেও নিয়মিত পরিচর্যার দরকার হয়। মূলত পরিচর্যার অভাবেই এই গাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, গাব মূলত দুই ধরনের—দেশি গাব ও বিলাতি গাব। বিলাতি গাব মিষ্টি ও সুস্বাদু হলেও দেশি গাব তুলনামূলক কম মিষ্টি এবং কিছুটা কষযুক্ত হয়। এছাড়া দেশি গাবের কাঁচা ফল সবুজ এবং পাকলে হলুদ রঙের হয়ে থাকে।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের চিরসবুজ এই বৃক্ষটির বৈজ্ঞানিক নাম ডায়োস্পাইরাস ব্ল্যাঙ্কোই (Diospyros blancoi)। ইংরেজিতে একে মেবলো (Mabolo), কোরিয়ান ম্যাঙ্গো (Korean mango) বা ভেলভেট অ্যাপেল (Velvet apple) নামে ডাকা হয়। বিলাতি গাব গাছ সাধারণত মাঝারি আকারের হয়ে থাকে এবং এর উচ্চতা ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে গাছে ফুল ফোটে এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। কাঁচা ফল হালকা সবুজ বা বাদামি রঙের হলেও পাকলে তা উজ্জ্বল বাদামি কিংবা গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে। পাকা ফলের ভেতরের অংশ সাদা, মাখনের মতো নরম এবং সুগন্ধযুক্ত হয়। ফল হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি এটি দিয়ে জুস, ডেজার্ট, ফ্রুটকেক ও ক্রিমও তৈরি করা হয়।

আপেলের মতো দেখতে এই ফলের ত্বক হালকা বাদামি ও লোমশ এবং ভেতরের মাংসল অংশ হালকা ক্রিম রঙের হয়ে থাকে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকা এই ফল গ্রামাঞ্চলের বনবাদাড় বা বাড়ির আশপাশে কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে। বাদুড় ফল খাওয়ার পর বীজ ছড়িয়ে দিলে সেখান থেকে সহজেই নতুন চারা জন্মায়। প্রতিকূল পরিবেশেও গাছটি টিকে থাকতে সক্ষম। কাঁচা অবস্থায় অনেকে এটি সবজি হিসেবে রান্না করে খান, আবার কেউ নুন-মরিচ দিয়ে মেখে খেতে পছন্দ করেন। এছাড়া অপরিপক্ব অবস্থায় শিশুরা এর ভেতরের কোমল আঁটি খেয়ে থাকে।

পুষ্টিগুণেও অনন্য এই বিলাতি গাব। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য অংশে প্রায় ৫০৪ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি থাকে। এছাড়া এতে রয়েছে ৮৩–৮৪.৩ গ্রাম জলীয় অংশ, ২.৮ গ্রাম আমিষ, ০.২ গ্রাম চর্বি, ১১.৮ গ্রাম শর্করা, ১.৮ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ১১.৪৭ গ্রাম চিনি, ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩৫ আইইউ ভিটামিন-এ, ১৮ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৬ মিলিগ্রাম আয়রন, ০.০২ মিলিগ্রাম থায়ামিন, ১৮ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি, ১১০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম এবং ৩০৩ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম।