রাজধানীর বনানীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি ফুডকোর্টের আটটি নির্মিত দোকানকে ‘খালি জায়গা’ বা স্পেস দেখিয়ে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিধি বহির্ভূতভাবে এই বরাদ্দ পেয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এক নেতা, যার পেছনে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করছেন খোদ ডিএনসিসির কর্মকর্তারা। দৈনিক মাত্র দেড় টাকা বর্গফুট দরে এই দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ৩০০ বর্গফুটের একটি দোকানের মাসিক ভাড়া দাঁড়িয়েছে মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।
বনানী কাঁচাবাজারের পাশে অবস্থিত এই ফুডকোর্টটি সাবেক মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছিল। পূর্বে পরিত্যক্ত এই জায়গায় বাজারের ক্রেতারা গাড়ি পার্ক করতেন। তবে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর ফুডকোর্টটি আর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন বা বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এটি ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমানের ঘনিষ্ঠ এবং বনানী থানা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন সিকদার এখানে অবৈধভাবে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই জায়গার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বনানী ইউনিট বিএনপি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতাদের হাতে, যারা নিয়মিত চাঁদা তুলতেন।
সম্প্রতি বনানী থানা বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রতিষ্ঠান ‘এমএমজেড এন্টারপ্রাইজ’কে এই ফুডকোর্টটি বরাদ্দ দেয় ডিএনসিসি। গত ১০ জুন মামুন এই জায়গাটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। নথিপত্র অনুযায়ী, মাত্র ১২ দিনের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁকে টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এর এক সপ্তাহ পর ব্যবহারের অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ থেকে দেওয়া চিঠিতে একে ‘বনানী ডিএনসিসি কাঁচাবাজারের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ৩৯৮ বর্গফুট জায়গা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে বন্ধনীর ভেতরে লেখা রয়েছে ‘নির্মিত ৮টি ফুডকোর্ট’। দৃশ্যমান দোকানকে এভাবে ‘জায়গা’ দেখিয়ে সম্পত্তির শ্রেণী পরিবর্তন করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডিএনসিসির কর্মকর্তারা।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্মিত দোকানগুলোকে মার্কেট উপ-আইনের আওতায় এনে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি ও লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে ভিন্ন পথে নামমাত্র মূল্যে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মামুনকে দেওয়া আটটি দোকানের প্রতিটির ছয় মাসের ভাড়া ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা, যা মাসে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৩৫ টাকা। এছাড়া দোকানপ্রতি ফেরতযোগ্য ১ লাখ টাকা জামানত নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার পর এখন এই দোকানগুলো থেকে বর্তমান অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে এককালীন ৫ লাখ টাকা জামানত এবং মাসে ৬০ হাজার টাকা করে ভাড়া দাবি করা হচ্ছে, যা সরকারি ভাড়ার চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি।
আব্দুল্লাহ আল মামুন দলীয় শৃঙ্খলা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের ১৬ নভেম্বর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। মামুন স্বীকার করেছেন যে ফুডকোর্টের অনুমোদন পেতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করা হলেও তিনি নিজে মাত্র একটি দোকান (৭ নম্বর দোকান) পেয়েছেন। বাকি সাতটি দোকান বনানী থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি কবির হোসেন ভাগ করে নিয়েছেন বলে তাঁর দাবি। তবে এ বিষয়ে আবু সাঈদ ও কবির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথ ‘ফিটফাট’ রাখার নির্দেশনা বাস্তবায়নে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফুডকোর্ট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় আপাতত এটিকে খালি জায়গা হিসেবে অস্থায়ী ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।

