বান্দরবানের রহস্যময় ‘আলী সুড়ঙ্গ’: রোমাঞ্চ আর ইতিহাসের হাতছানি

বান্দরবানের আলীকদমে পাহাড়ের গভীর খাদে অবস্থিত এক প্রাকৃতিক বিস্ময় ‘আলী সুড়ঙ্গ’। হাজার বছরের পানিপ্রবাহ আর বাতাসের ঘর্ষণে সৃষ্ট এই রহস্যময় গুহাটি দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন শত শত পর্যটক। চিরহরিৎ বনে ঘেরা খাড়া পাথুরে পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা এই সুড়ঙ্গটি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক রোমাঞ্চকর আকর্ষণ। রহস্য আর রোমাঞ্চের মেলবন্ধনে তৈরি এই সুড়ঙ্গটি ঘিরে পর্যটকদের কৌতূহলের যেন শেষ নেই।

আলী সুড়ঙ্গে পৌঁছানোর পথটি বেশ রোমাঞ্চকর ও কিছুটা দুর্গম। এই সুড়ঙ্গে যেতে হলে পর্যটকদের প্রথমে আলীকদম উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তৈনখালের তীরে অবস্থিত মারমা পাড়ায় (মং চ প্রু পাড়া) পৌঁছাতে হয়। এই পাড়া পর্যন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়। এরপর শুরু হয় গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলার পথ। এই পথেই দেখা মেলে রংরাং পাহাড় থেকে নেমে আসা তৈনখালের। খালের দুই পাশে খাড়া দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি পাহাড়ের মাঝখানের সরু খাত ধরে বয়ে যাওয়া একটি ঝিরি পথ ধরে প্রায় ৪০০ মিটার এগোলেই দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত আলী সুড়ঙ্গের।

সুড়ঙ্গটি অবস্থান করছে প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া ও শতাধিক ফুট উঁচু একটি পাথুরে পাহাড়ের খাদে। ঝিরির পানিপ্রবাহ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচুতে রয়েছে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ। অতীতে এই খাড়া পাহাড় বেয়ে সুড়ঙ্গে ওঠা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক ছিল। তবে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সাত-আট বছর আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন সেখানে দুই ধাপে দুটি লোহার সিঁড়ি নির্মাণ করে দেয়। এর ফলে এখন দর্শনার্থীরা অনায়াসেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে পারেন।

আলীকদমের ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিন্টু কর্মকার জানান, প্রবেশমুখ থেকে সুড়ঙ্গটি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ফুট দীর্ঘ। সুড়ঙ্গের ভেতরে মাত্র ১০ ফুট প্রবেশ করলেই চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে যায়। মশাল বা টর্চের আলো জ্বালিয়ে প্রায় ৬০ ফুট ভেতরে যাওয়ার পর পথটি বেশ সংকীর্ণ হয়ে আসে। এই সংকীর্ণ অংশটি পার হওয়া বেশ কঠিন হলেও, তা অতিক্রম করতে পারলে সুড়ঙ্গের অপর প্রান্ত অর্থাৎ পেছন মুখ দিয়ে বাইরে বের হওয়া সম্ভব। সুড়ঙ্গের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশে প্রচুর বাদুড়ের বসবাস রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন এখানে প্রচুর পর্যটক আসলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারে দর্শনার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে।

আলী সুড়ঙ্গের নামকরণ এবং এর সৃষ্টি নিয়ে নানা লোকগাথা ও ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। আলীকদম মৌজার প্রবীণ হেডম্যান অংহ্লাচিং মারমার মতে, এই সুড়ঙ্গ ও এলাকার নাম এসেছে ‘আলেকোয়াতং’ থেকে। একসময় এই পাহাড়ে প্রচুর বুনো কবুতর থাকত এবং পাড়ার শিশুদের রোগমুক্তির জন্য সেখানে কবুতর উৎসর্গ করার মানত করা হতো। মারমা ভাষায় ‘আলে’ অর্থ উৎসর্গ বা পূজা, ‘কোয়া’ মানে কবুতর এবং ‘তং’ শব্দের অর্থ পাহাড়। অন্যদিকে, ‘গিরিনন্দিনী আলীকদম’ বইয়ের লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমদের মতে, সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মোগল ও আরাকান শাসনের কারণে টিকতে না পেরে চাকমা রাজপরিবার এবং মোগল যুবরাজ শাহ সুজার কিছু অনুসারী এই অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে আরাকান থেকে তঞ্চঙ্গ্যারাও এখানে আসেন। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার ‘আইলেংতং’ শব্দ থেকেই কালক্রমে আলীকদম ও আলী সুড়ঙ্গ নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।