মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরও কেন ১০০ ডলারের নিচে তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বেড়েছে। তবে এমন অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচেই অবস্থান করছে। এর মূল কারণ হলো, সরবরাহের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদাও কমেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও গায়ানার মতো দেশগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প পথে তেল রপ্তানি দামের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করেছে।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হচ্ছে, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর সাত মাস আগের ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেলের তুলনায় অনেক কম। হরমুজ প্রণালির অবস্থাও বেশ নাজুক; ৩০ আগস্টের আগের সপ্তাহে এই পথে দৈনিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হলেও এখন তা কমে ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমেছে। তবে শিল্প–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন হিসাব বলছে, দৈনিক গড় হিসেবে এখনো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে যাচ্ছে। রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিমবার্টির মতে, বর্তমান সরবরাহের ভিত্তিতে ব্রেন্টের ‘ন্যায্য’ দাম হওয়া উচিত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৫ ডলার, যদিও মঙ্গলবার তা ৯৮ ডলারের ওপর ছিল।

উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ ব্যবহারের মাধ্যমে সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। সৌদি আরামকো তাদের রাস তানুরা বন্দর থেকে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে সরবরাহ বজায় রাখছে। তবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর হুতিদের নৌ অবরোধের কারণে চাপের মুখে রয়েছে, যেখানে অগাস্টে রপ্তানি আগের তিন মাসের গড়ের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমেছে। অন্যদিকে, মিসরের সিদি কেরি বন্দর ও ইরাকের রপ্তানি বৃদ্ধি কিছুটা ভারসাম্য তৈরি করেছে। একই সাথে ওপেকের বাইরের দেশগুলো চলতি বছর সম্মিলিতভাবে দৈনিক আরও ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়াবে বলে জানিয়েছেন রিস্টাড এনার্জির প্রতিষ্ঠাতা জারান্ড রিস্টাড।

চাহিদার দিক থেকে চিত্রটি বেশ স্পষ্ট। তৃতীয় প্রান্তিকে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা ৩৫ লাখ ব্যারেল কমেছে, যার অর্ধেকের বেশি চীনের কারণে হয়েছে। চীনে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের প্রসারে তেলনির্ভর জ্বালানির চাহিদা কমছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক চীন বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রেখেছে, যা বাজারের তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে।

তবে স্পট মার্কেটের পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক। নভেম্বরে সরবরাহের জন্য দুবাই ও ওমানের তেলের দাম দুবাইয়ের নির্ধারিত দামের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১৯ থেকে ২০ ডলার বেশি। গতকাল সোমবার ওমানের ফিউচার্সের দাম ছিল ১০৪ দশমিক ৫৪ ডলার [104, ১০৪]। স্পট মার্কেটে দুবাইয়ের তেলের দাম ছিল ১০৫ দশমিক ১০ ডলার [105, ১০৫]। প্রশ্ন: এর অর্থ কি তেলের বাজারে সংকট এখনো আছে? উত্তর: আছে। বিশ্লেষক ডেভিড ফাইফের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এবং ডিজেল বাজারের ঘাটতিও বাড়ছে। মরগ্যান স্ট্যানলি ও গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আগামীতে তেলের দামের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, যেখানে ২০২৭ সালে এই দুই ধরনের তেলের দাম যথাক্রমে ৮০ ও ৭৫ ডলার হতে পারে [2027, ২০২৭]। প্রশ্ন: তাহলে মূল কথা কী? উত্তর: মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহ কমেছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে।

তবে ফেব্রুয়ারির তুলনায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এখনো ২৩ শতাংশ বেশি।তবে বিষয় হলো ২০২৬ সালের তেল উৎপাদনের পূর্বাভাস কমিয়ে ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে রাশিয়া।

তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ব্রেন্টের দাম হবে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলার, ডব্লিউটিআই ৮০ ডলার।