জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবি স্থান পেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি নেই। এমনকি তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণার কথাও প্রদর্শনীতে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ৫ আগস্ট শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শনিবার শেষ হয়েছে। প্রদর্শনীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রদর্শনীর প্রথম অংশে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ইতিহাসকে ‘আজাদী, অতঃপর স্বপ্নভঙ্গ’ শিরোনামে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে একনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দিয়ে শুরু করে জেনারেল নিয়াজির রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শন ও বিজয় অর্জনের চিত্র দেখানো হয়েছে। তৃতীয় অংশে ‘একনায়কতন্ত্র’ শিরোনামে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অংশে তাঁর দেশে ফেরা, পারিবারিক ভোজ, ১৯৭২ সালে ভারতীয় বাহিনীর বিদায়ী প্যারেডে অংশগ্রহণ, ১৯৭৪ সালের রক্ষীবাহিনীর তাণ্ডব, দুর্ভিক্ষ, বাকশাল প্রতিষ্ঠা, তাঁর মৃত্যুর খবর এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে।
চতুর্থ অংশে ‘সামরিক স্বৈরশাসন’ শিরোনামে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বেগম খালেদা জিয়া ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ছবি ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পঞ্চম অংশে ‘ফ্যাসিবাদ’ শিরোনামে ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাবলি এবং ষষ্ঠ অংশে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ শিরোনামে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদসহ সমন্বয়কদের ছবি ও আন্দোলনের বিভিন্ন চিত্র স্থান পেয়েছে।
প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কয়েক দিন ধরে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। শনিবার প্রদর্শনী পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এখানে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ আছে, জিয়াউর রহমান সাহেবের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নেই কেন? উনি তো অটোক্র্যাট শাসক ছিলেন না। তো ওনারটা এই জন্যই তো আমরা আনিনি।’ তিনি আরও দাবি করেন, যারা কর্তৃত্ববাদী, আগ্রাসী ও জুলুমবাজ ছিলেন, তাদেরই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া যে মুক্তি পেয়েছেন ন্যায্যতার ভিত্তিতে, সেটিও এখানে আমাদের ডকুমেন্টারিতে তুলে আনা হয়েছে। ইতিহাসে যার যে কল্যাণকর অবদান আছে, সবগুলোর প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধাশীল।’
জামায়াতের আমিরের ব্যাখ্যার পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবির ওপরে যেমন ‘ঐতিহাসিক ভাষণ’ লেখা হয়েছে, আবার অন্য ছবিতে তাঁকে স্বৈরশাসক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমানের একটি ছবিও না থাকায় বিষয়টি নিয়ে শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র ও জুলাই আন্দোলনের ছবি থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি বা পোস্টার না থাকা খুবই রহস্যজনক।
কেউ কেউ বলছেন, জামায়াত প্রদর্শনীতে স্বাধীনতার আগে ও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ইতিবাচক ও নেতিবাচক’—দুই ধরনের ভূমিকাই তুলে ধরেছে।যেমন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের ছবির ওপরে জামায়াত লিখেছে, ‘৭ মার্চ ১৯৭১; রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান’।

