বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা করছে সরকার

রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ বিচরণ নগরবাসীর জন্য এক বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘বাংলার টেসলা’ নামে পরিচিত এই রিকশাগুলোর বেপরোয়া গতি, সিগন্যাল অমান্য করা এবং উল্টোপথে চলাচলের কারণে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা, যেখানে যাত্রীরা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশেষ করে ভিআইপি সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়েই এসব রিকশার উল্টোপথে চলাচল জনমনে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেয়ার ফলে একদিকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবমিলিয়ে এই যন্ত্রদানব ট্রাফিক বিভাগ, যাত্রী ও সরকারের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত দুই বছরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ঢাকায় এসব রিকশার সংখ্যা গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সময় মূল সড়কে অটোরিকশা দেখামাত্র ট্রাফিক সার্জেন্টরা বড় অঙ্কের জরিমানা করতেন, যার ভয়ে চালকরা মূল সড়কে ওঠার সাহস পেতেন না। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক শেল্টারে এসব রিকশা দেদারছে বিস্তার করেছে। যারা এই ব্যবসা ও গ্যারেজের সঙ্গে জড়িত তাদের অনেকেই সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এমনকি বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অবৈধ সংযোগ দিয়ে চার্জের ব্যবস্থা করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা বিক্ষোভ আন্দোলন করে। রাজধানীতে ঠিক কত রিকশা রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও একাধিক সংস্থার হিসাবে এই সংখ্যা অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ।

এই সংকট নিরসনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরো ঢাকা শহরকে আটটি ভৌগোলিক জোনে ভাগ করা হবে। প্রতিটি জোনের রিকশার জন্য আলাদা রং নির্ধারণ করা হবে এবং কোনো রিকশা তার নিজ জোনের সীমানা অতিক্রম করতে পারবে না। এছাড়া প্রতিটি রিকশায় ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করে ট্রাফিক পুলিশ মুহূর্তেই মালিক ও চালকের তথ্য যাচাই করতে পারবে। অবৈধ গ্যারেজে বিদ্যুৎ চুরির বদলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব সোলার চার্জিং হাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকার দ্রুতই এই নীতিমালা কার্যকর করতে যাচ্ছে, যেখানে যানবাহনের মান, কারিগরি সক্ষমতা এবং চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, বুয়েটের মাধ্যমে কারিগরি যাচাই-বাছাই শেষে রিকশাগুলোকে সার্টিফিকেট দেয়া হবে এবং ঢাকার বাইরে থেকে আসা কোনো অটোরিকশা রাজধানীতে চলতে পারবে না। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই বছরে অটোরিকশার দাপট যেভাবে বেড়েছে, তাতে নীতিমালা দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা কতটা সম্ভব হবে তা দেখার বিষয়।