পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে পাঁচ বিষয়ে কঠোর এপিজি

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) তাদের এবারের মূল্যায়নে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের বাস্তব চিত্রের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে। সংস্থাটি মূলত পাঁচটি নির্দিষ্ট বিষয় খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা কার্যকর কি না, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর তদন্ত ও মামলা হয়েছে কি না, আদালতে দণ্ড হয়েছে কি না এবং পরিশেষে পাচার হওয়া সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়েছে কি না।

এ লক্ষ্যে এপিজি সেক্রেটারিয়েটের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে। বুধবার সচিবালয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে প্রতিনিধিদলটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া সফরকালে প্রতিনিধিদলটি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের চতুর্থ পারস্পরিক মূল্যায়নের (মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন) প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই সফরটি পরিচালিত হচ্ছে। ১২ থেকে ১৩ আগস্ট সফরকালে এপিজির দলটি জাতীয় সমন্বয় কমিটি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি একটি 'প্রি-মিউচুয়াল ইভ্যালুয়েশন প্ল্যানিং ভিজিট', যেখানে বাংলাদেশের প্রস্তুতি, দুর্বলতা এবং বাস্তব সক্ষমতা যাচাই করা হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) পুরো মূল্যায়নের লিড এজেন্সি এবং এর প্রধানকে চিফ কো-অর্ডিনেটর করা হয়েছে। প্রতিটি সংশ্লিষ্ট সংস্থায় ফোকাল পারসনও নির্ধারণ করা হয়েছে।

এপিজির এই মূল্যায়ন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কোনো দেশ দুর্বল বা নন-কমপ্লায়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো সেই দেশের সঙ্গে লেনদেনে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। এপিজি এবার কেবল পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে অপরাধের অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে তা উদ্ধারের সক্ষমতা কতটা তৈরি হয়েছে, সেটিকেই মূল পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখছে।

এদিকে বাংলাদেশ বর্তমানে পাঁচটি ক্ষেত্রে জাতীয় মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, গণবিধ্বংসী অস্ত্র বিস্তারে অর্থায়ন, এনজিও ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং ভার্চুয়াল সম্পদ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি। জুলাইয়ের শেষদিকে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এসব মূল্যায়নের বড় অংশের কাজ শেষ হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে তা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন মানি লন্ডারিং ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি মূল্যায়নে কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও এপিজি ও এফএটিএফের মূল্যায়নে আসল বিষয় হবে কার্যকারিতা। তারা দেখতে চাইবে কতটি বড় অর্থ পাচারের ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে, কতটি মামলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে, কতজন অপরাধী সাজা পেয়েছেন এবং কত সম্পদ বাস্তবে উদ্ধার হয়েছে। তার মতে, আগামী এক বছর হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ আইন প্রণয়নের চেয়ে বাস্তব ফলাফলই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে।