দীর্ঘদিন উচ্চ পাসের হারের প্রবণতা বজায় থাকার পর টানা দুই বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিম্নমুখী। গত সোমবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর অর্থাৎ ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ১৯ হাজার কমেছে। এবার মোট ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক দুর্বলতা সার্বিক পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে। কুমিল্লা ছাড়া অন্য আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে। ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ। এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজির ফল গত বছরের তুলনায় খারাপ হয়েছে; এবার ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি, যা গত বছর ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। এই দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক হওয়ায় অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সরাসরি সামগ্রিক ফলাফলের ওপর পড়েছে।
মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফলও পাসের হার নিম্নমুখী হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। এ বিভাগে ছয় লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও পাসের হার বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার তুলনায় অনেক কম। বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৭৭ শতাংশের বেশি এবং ছাত্রীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। মানবিক বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার প্রায় ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের প্রায় ৫৪ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জনের মধ্যে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন পাস করেছে। অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা মোট পরীক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি। এছাড়া ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যা গত বছরের ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেশি।
ফলাফলের সূচকে এবারও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ছাত্রীদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছাত্রদের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যেও ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি এবং ছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজারের বেশি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে শীর্ষে থাকলেও ময়মনসিংহ বোর্ড পাসের হারে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ভোকেশনাল ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলও প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশ্নের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং বিদ্যালয়ে শিখন মান ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এই ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ১০ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পর পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারা এবং ইংরেজি-গণিতে বড় দুর্বলতা বিদ্যালয়ে শিখন মান ও শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবারের ফলাফলকে ‘সুন্দর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়া যায় না।’ একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ, যা ২০০৮ সাল থেকে বাড়তে শুরু করে। ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, শুধু পাস-ফেলের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

