লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ছাড়া আপাতত উপায় নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী

দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাস–সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সামর্থ্য ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার কারণেই বর্তমান সংকট শুরু হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা টার্মিনালটির মেরামত কাজ শেষ না করছেন, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের কোনো গতি নেই। তিনি বলেন, ‘এইটুকুই বলতে চাই, উই আর ওয়ার্কিং। এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নাই। কারণ, এখন আমি গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না বা উইদাউট এফএসআরইউ, আমার যে গ্যাস আছে, সেটাও নামাতে পারব না।’

মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে পুরো সিস্টেমটি টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখা লাগবে বলে সতর্ক করেছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে লোডশেডিং যাতে কম হয় এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বজায় থাকে, সেই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দিকেই সরকার নজর দিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ২০২৯ সালকে লক্ষ্য করে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। ইতিমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া শিল্পে গ্যাস–সংকট কমাতে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস পৌঁছে দেওয়া এবং মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি কনটেইনারে গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের টেসলা’ হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এগুলোর বেশির ভাগই রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুতের পিক আওয়ার বদলে রাত ১২টায় গিয়ে ঠেকছে এবং চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও তিনি জানান। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ উৎসাহিত করতে সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং পাঁচ বছরের ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

মন্ত্রী আরও জানান, কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্থাকে একচেটিয়া তেলের ব্যবসা দেওয়া হচ্ছে না, বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নীতি করা হচ্ছে। নিজেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন ও ঋণের কিস্তি দেওয়া কতটা কঠিন তা তিনি বোঝেন। আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।

অনুষ্ঠানে সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, দেশের ৮৪ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ জানান, গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে এবং ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন জ্বালানি খাতে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এছাড়া জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের কারণে সরকারের ওপর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করেন।