ফুলবাড়ীর কয়লা সম্পদ নিয়ে জিসিএম রিসোর্সেসের ব্যবসায়িক তৎপরতা অব্যাহত

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া ২০০৬ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এশিয়া এনার্জি বা জিসিএম রিসোর্সেসের তৎপরতা এখনো থামেনি। কোম্পানিটি নাম পরিবর্তন করে জিসিএম রিসোর্সেস নামে নিয়মিত ব্যবধানে কয়লা উত্তোলনের অগ্রগতির দাবি করে আসছে। এই দাবির মাধ্যমে তারা লন্ডন শেয়ারবাজারে নিজেদের শেয়ারের দর বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, যা কার্যত মাটির নিচে থাকা ফুলবাড়ীর কয়লা ‘বিক্রি’ করার শামিল বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) কাছ থেকে এশিয়া এনার্জি দুই বছরের জন্য কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের লাইসেন্স পেয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয় ২০০৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। তবে এশিয়া এনার্জির ঢাকা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, তারা নিয়মিত লাইসেন্স ফি ও প্রতিবেদন জমা দিয়ে আসছে। এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক জিসিএম রিসোর্সের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। ২০০৫ সালে জমা দেওয়া তাদের খনি উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা যাচাইয়ের জন্য সরকার ২০০৬, ২০০৭ ও ২০১২ সালে তিনটি কমিটি গঠন করেছিল, যার প্রতিটিই ফুলবাড়ী প্রকল্পের বিপক্ষে প্রতিবেদন দিয়েছিল।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপি কোম্পানি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অনুসন্ধানের চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে এশিয়া এনার্জির কাছে সেই লাইসেন্স হস্তান্তর করা হয়। ২০০৪ সালে এশিয়া এনার্জি উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা করলে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে খনি এলাকায় সমাবেশ চলাকালে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে তিনজন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তেল-গ্যাস কমিটির সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যার অন্যতম শর্ত ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা।

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যমতে, ২০০৪ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ২০০৭ সালে এশিয়া এনার্জি নাম বদলে জিসিএম রিসোর্সেস হয়। কোম্পানিটি গত ২০ বছর ধরে ফুলবাড়ী খনিকে তাদের সম্পদের অংশ হিসেবে দেখিয়ে শেয়ার ব্যবসা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের শেয়ারের দর বৃদ্ধির পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিতকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সরকারের ইতিবাচক ইঙ্গিতে শেয়ারের দর চাঙা হয় এবং এর সঙ্গে সরকারের লোকজনের সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

জিসিএম রিসোর্সেসের দাবি, তারা ১১/সি-৯৪ চুক্তির আওতায় কাজ করছে এবং সমীক্ষা সম্পন্নের মেয়াদ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ২০২০ সালে তারা চীনের পাওয়ার চায়নার সঙ্গে ফুলবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে ফুলবাড়ী আন্দোলনের নেতারা এই কার্যক্রমকে প্রতারণামূলক বলে অভিহিত করেছেন এবং যেকোনো মূল্যে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাম ছিল দেড় পেন্স।