নটর ডেম কলেজের কর্মী লিপিকা গমেজ হত্যা রহস্য যেভাবে উন্মোচন হলো

রাজধানীর পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একা থাকার সুযোগ নিয়ে নটর ডেম কলেজের অফিস সহকারী লিপিকা জুলিয়ানা গমেজকে (৪০) চুরির উদ্দেশ্যে ঢুকে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে police ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার ১২ দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা পর্যায়ে রয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, লিপিকা গমেজ দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। এই তথ্যটি জানতেন পাশের বাসার দারোয়ানের ছেলে জুয়েল রানা (২১)। লিপিকা যখন পাঁচতলা থেকে চারতলার ফ্ল্যাটে বাসা পরিবর্তন করেন, তখন জুয়েল মজুরির বিনিময়ে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। সেই সূত্রেই জুয়েল জানতে পারেন লিপিকার একা থাকার বিষয়টি। পরে জুয়েল তাঁর বন্ধু নজরুলের (২২) সঙ্গে চুরির পরিকল্পনা করেন। চুরির উদ্দেশ্যে ঘটনার দুই দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর তাঁরা এলাকাটি রেকি করেন। ঘটনার দিন ২০০ টাকা দিয়ে একটি নোস প্লায়ার্স নিয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে যান। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে নজরুল রশি বেয়ে ছাদ থেকে নেমে ভেন্টিলেটর ভেঙে লিপিকার ফ্ল্যাটে ঢোকেন এবং ভেতর থেকে প্রধান দরজা খুলে জুয়েলকে ভেতরে নেন।

বাসার ভেতরে জিনিসপত্র খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে লিপিকার ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি চিৎকার শুরু করেন। এ সময় নজরুল লোহার পাইপ দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। রক্তপাত বন্ধ করতে জুয়েল তাঁর মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে ধরেন, যার কিছুক্ষণ পর লিপিকার মৃত্যু হয়। এরপর তাঁরা লিপিকার দুটি মুঠোফোন, একটি হাতব্যাগ এবং সোনার গয়না মনে করে কিছু অলংকার নিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে পালিয়ে যান। পরে জানা যায়, চুরি করা অলংকারগুলো আসলে ইমিটেশনের ছিল। হাতব্যাগে থাকা ২৬ হাজার ৩৫০ টাকা তাঁরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন এবং চুরি করা ফোন দুটি সদরঘাট এলাকার শিবলু হোসেন ও জয়ের কাছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করে সেই টাকা ভাগ করে নেন তাঁরা।

পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর সকালে লিপিকা কলেজে না যাওয়ায় সহকর্মীরা তাঁকে ফোন করতে থাকেন। ফোন বন্ধ পেয়ে দুপুরে তাঁর সহকর্মী জনি ও জয় সূত্রাপুরের বাসায় যান। ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখে কেয়ারটেকার মিতুর কাছে থাকা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলতে দেখে এবং ভাঙা ভেন্টিলেটর লক্ষ্য করে শোবার ঘরে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় লিপিকার মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। ওই দিনই লিপিকার খালাতো ভাই প্রিন্স গমেজ বাদী হয়ে সূত্রাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পিবিআই চোরাই মোবাইルの সূত্র ধরে অবস্থান শনাক্ত করে সদরঘাট ও সূত্রাপুর এলাকা থেকে জুয়েল ও নজরুলকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নোস প্লায়ার্স, দুটি স্ক্রু ড্রাইভার ও চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার দুজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৭ মে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। বর্তমানে আসামিরা কারাগারে আছেন এবং মামলায় এ পর্যন্ত ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, লিপিকা গমেজ ১৯৯৪ সালে বিয়ে করেছিলেন এবং পরে পড়াশোনার জন্য লন্ডনে যান। দেশে ফেরার পর ২০০০ সালে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি। ২০১৩ সাল থেকে তিনি ওই বাসায় ঠাকুরমার সঙ্গে থাকতেন এবং ঠাকুরমার মৃত্যুর পর থেকে একাই বসবাস করছিলেন। ২০১৬ সালের মার্চে তিনি নটর ডেম কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন। তাঁর বাবা ও বড় বোন আগেই মারা গেছেন এবং মা গ্রামে থাকেন।