র‍্যাব বিলুপ্ত করে একই কাঠামোয় হচ্ছে ‘এসআরবি’, খসড়া আইন অনুমোদন

গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে প্রায় একই ক্ষমতা ও কাঠামো নিয়ে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের তথ্যবিবরণী অনুযায়ী, বিদ্যমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে এই বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হবে। তবে কাগজে-কলমে র‍্যাব বিলুপ্ত হলেও বাহিনীটির বর্তমান জনবল, সম্পত্তি, ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার প্রায় সবই নতুন এই ইউনিটে বহাল থাকছে।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গোপন বন্দিশালা পরিচালনার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র‍্যাব এবং এর তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দল বিএনপিও সংস্কারের পরিবর্তে সরাসরি র‍্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরির বদলে মূলত নতুন নাম ও পৃথক আইনি ভিত্তিতেই বাহিনীটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনের ২৭টি ধারার মধ্যে ২৬ নম্বর ধারায় র‍্যাব রহিত করার পাশাপাশি নতুন ইউনিটে এর ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৩ সালের যে সংশোধনী আইনের মাধ্যমে র‍্যাব গঠিত হয়েছিল, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে সেটি রহিত হবে। উল্লেখ্য, ২০০৪ (2004) সালে বিএনপি সরকারের সময় পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, তৎকালীন বিডিআর, কোস্টগার্ড ও আনসারের সদস্যদের সমন্বয়ে র‍্যাব গঠন করা হয়। তবে র‍্যাবের সব সম্পদ, অধিকার, ক্ষমতা, সুবিধা, তহবিল, ব্যাংক হিসাব, দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং আদালতে চলমান মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসআরবির নামে স্থানান্তরিত হবে। বর্তমানে কর্মরত র‍্যাবের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই শর্তে এসআরবির সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন।

নতুন এই এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট, যার প্রধান বা মহাপরিচালক হবেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। তবে খসড়া আইনের ৪(৩) ধারা অনুযায়ী, প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) এবং অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্যদের এই ইউনিটে প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। খসড়ায় ‘শৃঙ্খলা বাহিনী’ বলতে সংবিধানের ১৫২ (152) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত অর্থে সশস্ত্র বাহিনীকে বোঝানো হয়েছে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এই বিধানের সমালোচনা করে বলেন, তাঁদের সুপারিশ ছিল নতুন কোনো বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে তা কেবল পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করতে হবে, সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রাখা উচিত নয়। কারণ সশস্ত্র বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা মূল কমান্ড কাঠামোর বাইরে গিয়ে অপরাধে জড়ালে তা বাহিনীর পেশাদারত্ব ও ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

খসড়া আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এসআরবিকে। মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী সংগঠন, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে। এছাড়া নতুন আইনে এসআরবির ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। আগে কেবল সরকার র‍্যাবকে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারত, এখন আদালত, সরকার বা police মহাপরিচালক (আইজিপি) যেকোনো সময় এসআরবিকে যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন।

নতুন আইনে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ‘অনতিবিলম্বে’ নিকটবর্তী থানার হেফাজতে দিতে হবে। আবার ১৫(৪) ধারায় নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার কথা বলা হয়েছে। এই দুই পরস্পরবিরোধী বিধানের ফলে কাকে, কোন পরিস্থিতিতে এবং কত সময় এসআরবির হাজতে রাখা যাবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এই অস্পষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। কারণ গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, দেশে সন্ধান পাওয়া ৪০টি গোপন বন্দিশালার মধ্যে ২২ থেকে ২৩টিই ছিল র‍্যাবের। এছাড়া পুলিশের বিশেষ শাখার নথি বিশ্লেষণ করে প্রথম আলো ৭ বছরে (২০১৫-২১) [2015-21] ১ হাজার ৭টি ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনায় ১ হাজার ২৯৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছিল। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বাহিনীর অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।

নতুন আইনে র‍্যাবের তুলনায় একটি বড় সংযোজন হচ্ছে পাঁচ সদস্যের ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’। নাগরিকদের অভিযোগ এবং সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিষ্পত্তির জন্য এই কমিটি কাজ করবে। তবে এই কমিটির পাঁচজনের মধ্যে চারজনই হবেন সরকার ও পুলিশের নিজস্ব কর্মকর্তা। পঞ্চম সদস্য হবেন সরকার মনোনীত মানবাধিকার বা আইন বিষয়ে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। এই কমিটি সরাসরি কোনো শাস্তি না দিয়ে কেবল সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখবে। অন্যদিকে, বিদ্যমান আইনের ১৩ ধারায় র‍্যাব সদস্যদের ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ করা কাজের জন্য যে দায়মুক্তির বিধান ছিল, খসড়া আইনে তা রাখা হয়নি।

আইনের খসড়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান বলেন, সরকার র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি করার কথা বললেও এখানে নতুন কিছু নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, র‍্যাবের বর্তমান কাঠামো ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে নতুন নামে (এসআরএফ বা এসআরবি) চালু করার সিদ্ধান্ত অনেকটা পুরোনো জিনিস নতুন মোড়কে আনার মতো। পুরোনো কাঠামো ও ক্ষমতা বহাল থাকলে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের রাখার সুযোগ থাকলে এসআরবি আরেকটি ভয়ংকর বাহিনী হিসেবে সামনে আসতে পারে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি কেবল নাম পরিবর্তনের নয়। নতুন আইনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি পূরণে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এবং সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এমন বাহিনীর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যেকোনো আইন কতটা ভালো কাজ করবে তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তা প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে।