বেনজীরের মুক্তি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি দুদক

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন—এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পৌঁছায়নি। সংস্থাটির মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান। তিনি দাবি করেন, বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়টি দুদক গণমাধ্যমের মাধ্যমেই জেনেছে এবং আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার পর তারা প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, তিনি এমনটি মনে করেন না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, আন্তঃদেশীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। দুদক এমএলএ (পারস্পরিক আইনি সহায়তা) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, যা সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো হয়। তিনি জানান, দুদকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে কোন গ্রাউন্ডে বেনজীরকে ছাড়া হয়েছে, তা এখনো দুদকের অজানা।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত বেনজীরের জামিন আবেদন মঞ্জুর করে এবং সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। এর আগে ১৬ জুন বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় প্রত্যর্পণ প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল দুদক। নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরাতে তদন্তকারী সংস্থা বা আদালত কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র এবং অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ সংযুক্ত করে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে পাঠানো হয়।

এর আগে আবুধাবিস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) গত ১২ জুন বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে।

বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ‘রেড নোটিশ’ জারি করেছিল। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলা রয়েছে। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এই মামলার বাদী দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের প্রেক্ষিতে আদালতের গ্রেপ্তার পরোয়ানা জারি করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানকালে বেনজীর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, তিনি ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

এছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা হয়। ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ২০২১০ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি থাকাবস্থায় বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) এর জন্য আবেদন করেন এবং সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাবস্থায়ও তিনি একই জালিয়াতির আশ্রয় নেন। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অন্যান্য আসামিরা তার দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে জ্ঞাত থেকেও অনাপত্তি সনদ যাচাই না করে পাসপোর্ট ইস্যুর অনুমোদন প্রদান করেন। বেনজীর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ৬টি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তার প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক।