অতিরিক্ত চুল পড়ার কারণ কি থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা?

চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। চুলের যত্নে শ্যাম্পু, তেল, সিরাম কিংবা নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করেন অনেকে। কিন্তু অতিরিক্ত চুল পড়ার পেছনে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনজনিত সমস্যা থাইরয়েডের অস্বাভাবিকতা। গলার সামনের দিকে থাকা ছোট একটি গ্রন্থি থাইরয়েড। এটি মূলত টি-৩ ও টি-৪ হরমোন তৈরি করে, যা শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদনসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। চুলের ফলিকলও থাইরয়েড হরমোনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়। তাই হরমোনের মাত্রা কমে গেলে বা বেড়ে গেলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ঝরে পড়ার চক্রে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষণায় হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম—এই দুই অবস্থার সঙ্গেই ব্যাপকভাবে চুল ঝরে পড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

থাইরয়েডজনিত চুল পড়া সাধারণত মাথার নির্দিষ্ট একটি জায়গায় টাক তৈরি করার বদলে পুরো মাথাজুড়ে চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার মতো দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এটি টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামে পরিচিত এক ধরনের অতিরিক্ত চুল ঝরে পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। হাইপোথাইরয়েডিজমে চুল শুষ্ক, রুক্ষ ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমেও চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়া দেখা যেতে পারে। তবে শুধু চুল পড়ছে বলেই যে থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে, তা নয়। চুল পড়ার কারণ হিসেবে আয়রনের ঘাটতি, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক বা শারীরিক চাপ, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, কিছু ওষুধ, বংশগত চুল পড়া এবং অন্যান্য রোগও দায়ী হতে পারে।

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে চুল পড়ার পাশাপাশি ক্লান্তি, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে সমস্যা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক ধড়ফড় করা কিংবা মাসিকের অনিয়মের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই উপসর্গ থাকবে এমন নয়। কখনো চুল পড়াই হতে পারে সমস্যাটির প্রথম লক্ষণগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক হারে চুল পড়লে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সাধারণত টিএসএইচ এবং ফ্রি টি-৪ পরীক্ষা করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা যুক্ত হতে পারে। চুল পড়ার অন্য সম্ভাব্য কারণ, বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতি বা অন্যান্য পুষ্টিগত সমস্যা মূল্যায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, শুধু চুল পড়ার জন্য নিজের ইচ্ছায় থাইরয়েডের ওষুধ কিংবা বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। কারণ চুল পড়ার চিকিৎসা নির্ভর করে এর প্রকৃত কারণের ওপর। থাইরয়েডের অস্বাভাবিকতার কারণে চুল পড়লে মূল রোগটি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার পর অনেক ক্ষেত্রেই চুল পড়া কমে আসে এবং পুনরায় চুল গজাতে শুরু করে। তবে চুলের বৃদ্ধি একটি ধীর প্রক্রিয়া। তাই থাইরয়েডের মাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার পরপরই মাথায় নতুন চুল দেখা যাবে এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। দৃশ্যমান পরিবর্তনের জন্য কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। চুল পড়াকে তাই শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। বিশেষ করে হঠাৎ বা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চুল পড়ার সঙ্গে যদি ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন বা ঠান্ডা-গরম সহ্য করার ক্ষমতায় পরিবর্তনের মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে থাইরয়েডসহ অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সুস্থ চুলের জন্য শুধু বাইরে থেকে যত্ন নয়, শরীরের ভেতরের স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।