হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির জেরে কাতার এনার্জির এলএনজি সরবরাহের নিশ্চয়তা কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এই জলপথ দিয়ে এলএনজি পরিবহন প্রায় বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর জন্য জ্বালানি সংগ্রহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কাতার এনার্জি ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ও ইউরোপের বিভিন্ন ক্রেতাকে নোটিশ দিয়ে জানিয়েছে যে, অক্টোবর পর্যন্ত সরবরাহ বাতিল হতে পারে এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বরের পর সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও খোলাবাজার—এই দুই উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর কাতার ও ওমান থেকে নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এক-দুটি কার্গো এলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কাতার এনার্জির সর্বশেষ বাতিল হওয়া চালানগুলোর সময়সীমা নভেম্বরের প্রথমভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ইতালির জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত তাদের প্রায় ২৯টি এলএনজি চালান বাতিল হয়েছে, যার মাধ্যমে ৩৮০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস আমদানির কথা ছিল। এসব চালানে প্রায় ২০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস ছিল।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বিশেষজ্ঞ অ্যান-সোফি করবো মনে করেন, কোনো রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা চলতে পারে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি চালান রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫০৯টি চালানের তুলনায় নগণ্য। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯। এতে কাতারের গ্যাস বিক্রি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মতো। অন্য রপ্তানিকারকেরা অবশ্য ঘাটতির একাংশ পূরণ করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে, তবুও কাতারের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে, জাপানের মতো দেশগুলো ভিন্ন উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে আছে। ২০২৬ সাল নাগাদ বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং ২০২৮ সালের আগে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য ফেরার সম্ভাবনা কম।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলো বিশেষায়িত হওয়ায় দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করা কঠিন। কাতার এনার্জির ১২টি উৎপাদন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও সেগুলো পুনরায় চালু করতে দুই মাস সময় লাগতে পারে এবং রাস লাফান এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত আরও দুটি ইউনিট মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সীমিত পরিসরে পরিবহন শুরু হলেও নতুন করে হামলার ঝুঁকিতে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

