বাংলাদেশে বিদ্যমান পরীক্ষাপদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মহামূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যেখানে ১০ থেকে ১২ মাসে দশম শ্রেণির শিক্ষাবর্ষ শেষ হয়, সেখানে বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষা ও পরবর্তী ভর্তিপ্রক্রিয়া মিলিয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০ মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্তি পেতে এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এসএসসি পরীক্ষা অক্টোবর-নভেম্বর মাসে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বিপিএটিসি স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. মো. রওশন জামাল। তিনি নতুন শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি এই শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন।
আগামী মার্চ মাসে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে এর সময়সূচিও প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষামন্ত্রী প্রথমে ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। পরে তিনি জানুয়ারি মাসে এসএসসি এবং জুন মাসে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, ডিসেম্বর মাসে শীতকালীন ও ক্রিসমাসের দীর্ঘ ছুটির কারণে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া কোনো দেশেই প্রচলিত নয়। এর চেয়ে অক্টোবর মাসে পরীক্ষা নিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত ও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশে জানুয়ারি মাসে দশম শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়া থেকে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি পর্যন্ত প্রায় ২০ মাস সময় লাগে, যা বিশ্বে এসএসসি সমমানের সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘতম সময়ের রেকর্ড। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যারা দশম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু করেছে, তারা ২০২৬ সালের মার্চে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। এরপর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তাদের উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস শুরু হবে। তারা এইচএসসি পরীক্ষা দেবে ২০২৮ সালের জুন বা জুলাইয়ে, যার ফল প্রকাশ হবে ওই বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে। প্রথম সুযোগে ভর্তি হতে পারলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করতে ২০২৯ সালের জুন মাস লেগে যাবে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই দীর্ঘসূত্রতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দক্ষিণ গোলার্ধের দেশ যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজ일্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলে দশম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পাস করতে মাত্র তিন বছর সময় লাগে। ভারতে তাদের অর্থবছরের সঙ্গে মিল রেখে একাডেমিক বর্ষ এপ্রিল থেকে মার্চের মধ্যে শেষ হয় এবং এর ভেতরেই পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ইউরোপে স্কুল বর্ষ সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত চলে। সিঙ্গাপুরে মাধ্যমিক (জিসিই ও-লেভেল) ও উচ্চমাধ্যমিক (জিসিই এ-লেভেল) পরীক্ষা সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে জানুয়ারি মাসে ফল প্রকাশ করা হয়।
সময়ের কথা চিন্তা করে এখনো অধিকাংশ ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্যান্ডার্ডাইজড ব্যাচেলরস ডিগ্রি তিন বছর মেয়াদি বা ১৮০ ক্রেডিটের হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেও স্ট্যান্ডার্ডাইজড ব্যাচেলরস ডিগ্রি তিন বছর মেয়াদি। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিসিনে ৪-৫ বছর সময় লাগে। উন্নত বিশ্বে কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা ডিগ্রি ছয় মাস থেকে তিন বছর মেয়াদি হলেও বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ডিগ্রি চার বছর মেয়াদি এবং এটি পাস করতে শিক্ষার্থীদের ৫-৬ বছর সময় লেগে যায়। আমাদের দেশে ঢালাওভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিষয় চার বছর মেয়াদি করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় একমাত্র পাবলিক পরীক্ষা (এইচএসসি) নেওয়া হয় ১২ ক্লাস পড়ার পর। দশম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা স্কুলেই অনুষ্ঠিত হয় এবং যারা এইচএসসি পড়বে না, তাদের স্কুল থেকেই সনদ দেওয়া হয়। সেখানে অক্টোবরে এইচএসসি পরীক্ষা হয়ে ডিসেম্বরে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এইচএসসির কিছু পরীক্ষা একাদশ শ্রেণিতেও নেওয়া হয় এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ও টিউটোরিয়াল আগেই শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফলে যোগ করা হয়।
বাংলাদেশে রাজনীতি ও আর্থসামাজিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে একজন ছাত্র হয়তো ২০৩৪ সালে ৪ বছর মেয়াদি স্নাতক পাস করবে। এরপর মাস্টার্স করলে আরও দুই বছর লাগবে। সব ঠিক থাকলে তারা শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ২০৩৬ সালের দিকে। আর বিসিএস পরীক্ষার প্যাকেজে ঢুকলে চাকরি শুরু করতে আরও দেরি হবে। এর বিপরীতে, অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দশম শ্রেণি শুরু করা একজন ছাত্র ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে এইচএসসি পাস করবে এবং ২০২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে যখন সে তিন বছরের স্নাতক শেষ করে বেরোবে, তখন বাংলাদেশের একজন ছাত্র প্রথম বর্ষ শেষ করে কেবল দ্বিতীয় বর্ষে পা দেবে। অস্ট্রেলীয় শিক্ষার্থীরা আনুষ্ঠানিক চাকরিতে প্রবেশ করবে ২০৩১ সালে।
শুধু সিস্টেমের ত্রুটির কারণে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর জীবন থেকে প্রায় ৫ বছর হারিয়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াতে দশম শ্রেণিতে ক্লাস শুরু থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত যেখানে মাত্র ৬-৭ বছর লাগে, সেখানে আমাদের দেশে লেগে যাচ্ছে ১০-১৪ বছর। ২০২৬ সালের ২০ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীর সম্মিলিত সময়ের অপচয় হিসাব করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ১০০ লাখ বছর। এই বিশাল সময়ের অপচয় দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ডেকে আনছে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা কাজে লাগাতে হলে এই তরুণ জনশক্তির সময়ের অপচয় রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
এই সংকট উত্তরণে একটি সমন্বিত শিক্ষাবর্ষ ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়ে ড. মো. রওশন জামাল বলেন, অক্টোবর মাসে এসএসসি পরীক্ষা শুরু করে ডিসেম্বরের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা যেতে পারে। এরপর জানুয়ারি মাস থেকে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু করে পরের বছরের মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং আগস্টে ফল প্রকাশ করা সম্ভব। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা ও ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তী বছরের জানুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করা উচিত। এই নতুন পদ্ধতিটি তাড়াহুড়ো না করে ২০২৭ সাল থেকে শুরু করা যায়। তবে সেশনজট দূর করতে ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব বন্ধ করা এবং সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রী যদি এই সমন্বিত শিক্ষাশৃঙ্খল তৈরি করতে পারেন, তবে তা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে এবং জাতি তাঁকে দীর্ঘকাল স্মরণ রাখবে।
১৮-২০ মাসে এসএসসি (ইয়ার টেন) সম্পন্ন করার বৃত্ত থেকে এ যাত্রাও বের হওয়া গেল না।
অথচ সারা দুনিয়ায় ১০-১২ মাসে সম্পন্ন হয়ে থাকে দশম শ্রেণি সমাপনী এই সার্টিফিকেট।

