দান-সদকার প্রতিদান পাওয়ার উপায় ও যেসব কারণে তা নষ্ট হয়

আর্তমানবতার সহায়তা এবং বিভিন্নমুখী দ্বীনি সহযোগিতার উদ্দেশ্যে আমরা দান-সদকা করে থাকি, যা আল্লাহতায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় একটি ইবাদত। এই ইবাদতের মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয় এবং পরকালীন জীবন সুখী ও সমৃদ্ধ হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি দাতার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।’ (সুরা হাদিদ : ১১)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কোনো পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না পছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ৯২)। সদকার গুরুত্ব সম্পর্কে উকবা ইবনে আমির (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘প্রতিটি মানুষ কেয়ামতের দিন তার সদকার ছায়াতলে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে ফয়সালা করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৭৩৩৩)।

দানের সওয়াব ও ফজিলত পাওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো, সম্পদ অবশ্যই হালাল ও বৈধ উপায়ে অর্জিত হতে হবে। অনেকে অনাথ, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনে কিংবা মসজিদ, মক্তব ও মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় কাজে দান করেন। কিন্তু এই দান যদি হারাম বা অবৈধ পথে উপার্জিত সম্পদ থেকে হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না এবং এর কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মোমিনগণ! তোমরা যা-কিছু উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা কিছু উৎপন্ন করেছি, তার উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো থেকে একটি অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। আর এরূপ মন্দ জিনিস (আল্লাহর নামে) দেওয়ার নিয়ত কর না, যা (অন্য কেউ তোমাদেরকে দিলে ঘৃণার কারণে) তোমরা চোখ বন্ধ না করে তা গ্রহণ করবে না।’ (সুরা বাকারা : ২৬৭)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা হালাল সম্পদ থেকে কিছু সদকা করে, আর আল্লাহতায়ালা শুধু হালাল বস্তুই গ্রহণ করেন, তখন রহমান তা ডান হাতে গ্রহণ করেন, যদিও তা একটি খেজুর পরিমাণ হয়। অতঃপর দানটি রহমানের হাতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি তা পাহাড়ের চেয়েও বড় ও বিরাট হয়ে যায়।’ (মুসলিম : ১০১৪)।

দান কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো রিয়া বা লৌকিকতা। অনেকে হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদ ব্যয় করলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে লোক দেখানো, যার ফলে তাদের যাবতীয় চেষ্টা-মেহনত বিফলে যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘(তোমরা তোমাদের দান-সদকা বরবাদ কোরো না ওই ব্যক্তির মতো) যে লোক দেখানোর উদ্দেশে আপন সম্পদ ব্যয় করে এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’ (সুরা বাকারা : ২৬৪)। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করলে প্রতিদান পাওয়া তো দূরের কথা, বরং তা জাহান্নামের কারণ হতে পারে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করা হবে, যাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো সেই ধনী ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ প্রাচুর্য দিয়েছিলেন। সে দাবি করবে যে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খরচ করেছে, কিন্তু আল্লাহ বলবেন, ‘মিথ্যা বলছ। তোমাদের দানের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তোমাদেরকে দানবীর বলা হবে। আর তা বলা হয়ে গেছে।’ (মুসলিম : ১৯০৫)।

দান করার পর গ্রহীতাকে খোটা দেওয়া বা কষ্ট দেওয়াও দান নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, দান করার পর তা ভুলে যাওয়া এবং পরকালে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশা রাখা উচিত। কিন্তু অনেকে গ্রহীতাকে খোটা দিয়ে তার মনে চরম আঘাত সৃষ্টি করেন, যা দানের প্রতিদান নষ্ট করে দেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের সদকাগুলোকে খোটাদান ও কষ্টদানের মাধ্যমে বরবাদ কোরো না।’ (সুরা বাকারা : ২৬৪)। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি; তাদের মধ্যে খোটা দানকারী অন্যতম। (তিরমিজি : ১২১১)।

পরিশেষে, আল্লাহর কাছ থেকে যথাপ্রাপ্য প্রতিদান পেতে হলে দান-অনুদান হতে হবে ইখলাস ও আন্তরিকতাপূর্ণ এবং রিয়া ও লৌকিকতামুক্ত। আমল যত বড়ই হোক না কেন, বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া তা আল্লাহর কাছে মূল্যহীন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যে যেমন নিয়ত করবে, সে তেমন ফল পাবে।’ (বোখারি : ১)।